মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী চুক্তির সম্ভাবনা নতুন আশার জন্ম দিলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন ও সংশয় রয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে যে, সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও জ¦ালানি রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী, গত এপ্রিলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে হামলার পর থেকে ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল সীমিত করে রেখেছিল।
পরবর্তী ধাপের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাঠামোগত চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের পর আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ আলোচনা শুরু হবে।
তবে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে দুটি বিষয় তুলে ধরেছিলেনÑ ইরানের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করাÑ তা পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডায় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।
জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং আমি মনে করি এটি সফল হবে। এখন এটি দ্বিতীয় ধাপে যাবে, যা সম্ভবত আরও সহজ হবে।’ তিনি এই চুক্তিকে ইরানের জন্য ‘পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত দেয়াল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আগামী শুক্রবার জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।
চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট : গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে তিন মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর আগের দিন চুক্তির খবর প্রকাশের পর দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমেছিল। তবে জ¦ালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, অন্তর্বর্তী এই চুক্তি সংঘাত বন্ধের পথে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’। তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত চুক্তি এখনো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিএনএনকে বলেন, স্বাক্ষরিত স্মারকটি ‘খুবই সাধারণ ধরনের একটি নথি’। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আগামী দুই দিনের মধ্যে চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।
এই যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে অধিকাংশসহ অন্তত সাত হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ¦ালানির বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে উভয় পক্ষ এখনো বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি : চুক্তি কার্যকর হলে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে এবং বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দেশটির জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই অর্থায়নের দায়িত্ব নিতে পারে উপসাগরীয় দেশগুলো, যেগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এসব সুবিধা পেতে হলে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির নিশ্চয়তা দিতে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা খুব বেশি ছাড় দেননি। তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু করতে তারা সম্মত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সতর্কতা : উভয় পক্ষ জানিয়েছে, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়, তা আগামী শুক্রবার থেকে পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলো এখনো ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।
এদিকে ট্রাম্প জানান, ইতোমধ্যে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো প্রণালি অতিক্রম করে যাতায়াত শুরু করেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ¦ালানি রপ্তানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গোপনে জাহাজ-থেকে-জাহাজে তেল স্থানান্তর কার্যক্রম তদারকি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আগামী ৬০ দিন হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল আরোপ করা হবে না এবং চূড়ান্ত চুক্তিতেও এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে তারা আশা করছে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে তারা প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। অবশ্য নৌপরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক নৌযান চলাচল পুরোপুরি ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো, ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে কি না। গ্রিসভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ডায়াপ্লাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ মাইন অপসারণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ‘কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস’ পর্যন্ত লাগতে পারে।
লেবানন প্রশ্নে অনিশ্চয়তা : ইসরায়েলের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননকে ঘিরে চলমান সংঘাতও এই চুক্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই সংঘাতের কারণে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইরান বলেছে, চুক্তির আওতায় লেবাননেও সব ধরনের সামরিক সংঘাত বন্ধ করতে হবে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তাদের সেনা মোতায়েন অব্যাহত রাখবে এবং হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিয়ে যাবে।
তবে ট্রাম্পও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকা- নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গতকাল তিনি বলেন, লেবানন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের আচরণে তিনি ‘সন্তুষ্ট নন’। উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইসরায়েল সরাসরি অংশ নেয়নি। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মার্চে লেবাননে অভিযান চালানো ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রত্যাহার এই চুক্তির কোনো শর্ত নয়। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইসরায়েলের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে হওয়া এই চুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে এখনো বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ফলে স্থায়ী শান্তির পথ কতটা সুগম হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন