দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে জনগণের আস্থার শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা এই সংস্থার। অথচ আজ সেই প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিন ধরে কার্যত কমিশনশূন্য অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে শুধু প্রশাসনিক স্থবিরতাই নয়, দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নতুন করে দুদকের শূন্যতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত ও প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত কার্যক্রমে কমিশনের অনুপস্থিতি যে বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করছে, তা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার পরিচয় নয় বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এক ধরনের অস্বস্তিকর বার্তা বহন করে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দুদকের কর্মকা-ে নতুন গতি দেখা গিয়েছিল। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাবেক ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, তলব ও তদন্তের উদ্যোগ জনমনে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সেই গতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। আইন অনুযায়ী অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে নতুন অনুসন্ধান, মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র অনুমোদনসহ বহু কাজ আটকে আছে।
প্রতিদিন শত শত অভিযোগ জমা পড়ছে দুদকে। দুর্নীতির শিকার মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় অভিযোগ জানাচ্ছেন। কিন্তু কমিশন না থাকায় সেসব অভিযোগের অধিকাংশই কার্যত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পড়ে আছে। এতে শুধু অভিযোগকারীরাই হতাশ হচ্ছেন না, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়েও সৃষ্টি হচ্ছে এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা। দুর্নীতিবাজদের কাছে এটি স্বস্তির, আর সাধারণ মানুষের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুদক একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এর কার্যকারিতা কোনো ব্যক্তি বা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কমিশন গঠনে দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই চালাতে হলে একটি দক্ষ, সৎ, নিরপেক্ষ ও সাহসী কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি।
প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে সার্চ কমিটি গঠনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই চলবে না, দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন করতে হবে। সেই কমিশনকে এমনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে তারা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, কেবল আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কোনো সরকারের একক কর্মসূচি নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে দুদককে কার্যকর, শক্তিশালী এবং জনআস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই হওয়া উচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু প্রশাসন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং জনগণের ভবিষ্যৎও।
দুদকের এই দীর্ঘ শূন্যতা আর টেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। সময় এসেছে দ্রুত কমিশন গঠন করে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও সচল ও কার্যকর করার। জনগণ সেটিই প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্রের স্বার্থও তাই বলে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল কিছু মামলার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি রক্ষার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে দুদকের নেতৃত্বশূন্যতা যত দীর্ঘ হবে, ততই দুর্বল হবে সুশাসনের ভিত। তাই আর বিলম্ব নয় দ্রুত কমিশন গঠন করে দুদককে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনাই রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন