ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ধরনও বদলে গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে যেখানে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রতিরোধ বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে, এখন সেখানে অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে গড়ে উঠেছে এক জটিল ও সুসংগঠিত ছায়াযুদ্ধ। এই গোপন প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে একদল নারী এবং ছদ্ম পরিচয়ে কাজ করা গোয়েন্দা সদস্য, যাদের ইউক্রেনীয় প্রতিরোধযোদ্ধারা ‘ভিদমা’ বা ‘ডাইনি’ নামে অভিহিত করেন। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা অধিকৃত অঞ্চলে বাজার, স্কুল, হাসপাতাল কিংবা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ের আড়ালে রুশ সেনাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। সংগৃহীত তথ্য গোপনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বার্তা বিনিময়ব্যবস্থার মাধ্যমে রুশ সেনাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, কথিত প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে রুশ সেনাদের কাছ থেকে ঘাঁটির ছবি ও অবস্থান সংগ্রহ করা হয়েছে। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরোধযোদ্ধাদের দাবি, এই কৌশল শুধু সামরিক ক্ষতিই করছে না, বরং রুশ সেনাদের মধ্যে গভীর মানসিক আতঙ্কও সৃষ্টি করছে।
নারীদের হাতে প্রতিরোধের নতুন শক্তি : ইউক্রেনের বিভিন্ন প্রতিরোধ সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নারীদের আত্মরক্ষা, টিকে থাকা এবং গোপন অভিযানের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। হাজার হাজার নারী বর্তমানে বিভিন্নভাবে প্রতিরোধযুদ্ধে যুক্ত রয়েছেন। অধিকৃত শহর মারিউপোলের প্রতিরোধ নেতাদের মতে, নারীরা এমন সব জায়গায় প্রবেশ করতে পারেন, যেখানে পুরুষদের পক্ষে যাওয়া কঠিন। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এমনকি বিদেশে আশ্রয় নেওয়া বহু ইউক্রেনীয় নারীও দূর থেকে এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। নিজেদের এলাকার ভৌগোলিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তারা ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও যাচাইয়ের কাজে সহযোগিতা করছেন। প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কর্মকা-ের মূল উদ্দেশ্য কেবল সামরিক আঘাত নয়; বরং রুশ বাহিনীর মনে এমন এক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা, যাতে তারা প্রত্যেক সাধারণ নাগরিককেও সম্ভাব্য প্রতিরোধযোদ্ধা হিসেবে দেখতে বাধ্য হয়।
শান্তি আলোচনা নিয়ে নতুন বার্তা দিল মস্কো : যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলেও রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, অতীতের ইস্তাম্বুলভিত্তিক আলোচনা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোকে ভিত্তি করে মস্কো নতুন করে সংলাপে বসতে প্রস্তুত। পুতিনের মতে, আলোচনার পথ কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী শান্তি উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পেছনে ইউক্রেনের অবস্থানই প্রধান কারণ ছিল। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাকে ভবিষ্যৎ আলোচনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
কিয়েভের শর্ত ও মস্কোর দাবি : দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে। রাশিয়া চায় তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হোক। পাশাপাশি ইউক্রেন যেন সামরিক জোটে যোগ না দেয় এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি, রুশ সেনা প্রত্যাহার, যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি, অপহৃত শিশুদের ফেরত এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
পারমাণবিক অস্ত্রকেই রক্ষাকবচ বলছে ক্রেমলিন : এদিকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখার প্রধান উপাদান হলো পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা।
আকাশযুদ্ধে নতুন অস্ত্র রাশিয়ার দ্রুতগতির ড্রোন : যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও সমানতালে চলছে। রাশিয়া সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের একটি দ্রুতগতির বাধাদানকারী ড্রোন-ব্যবস্থা উন্মোচনের ঘোষণা দিয়েছে। রুশ সূত্রের দাবি, নতুন এই ড্রোন উচ্চগতিতে উড়ে শত্রুপক্ষের আক্রমণকারী ও গোয়েন্দা ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সক্ষম। ভূমি, যানবাহন ও আকাশভিত্তিক বিভিন্ন সংস্করণে এটি ব্যবহার করা যাবে।
জ¦ালানি সংকটের শঙ্কায় রাশিয়া : যুদ্ধের প্রভাব এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ¦ালানির বাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশটির সরকার ডিজেল রপ্তানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। রুশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন ধরনের মজুত ব্যবহার করা হচ্ছে এবং উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত : ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান চিত্র একদিকে গোপন প্রতিরোধ, ড্রোন প্রযুক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের বিস্তার দেখাচ্ছে; অন্যদিকে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা, ভূখ-গত বিরোধ, নিরাপত্তা প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। ফলে ‘ডাইনি বাহিনী’র ছায়াযুদ্ধ, আকাশে ড্রোনের লড়াই, পারমাণবিক শক্তির কূটনীতি এবং জ¦ালানি নিরাপত্তার সংকটÑ সব মিলিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত এখন কেবল দুই দেশের যুদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন