বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দেশের নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণ, নাব্য নিশ্চিতকরণ, টার্মিনাল পরিচালনা ও নদী ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, ড্রেজিং, নদী খনন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু এসব কর্মকা-ের একটি অংশ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগ, বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়লেও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। কোথাও প্রকল্পের সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে, কোথাও ব্যয় সংশোধনের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে টেন্ডারে সীমিত প্রতিযোগিতা, একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি কিংবা কারিগরি শর্ত এমনভাবে নির্ধারণের অভিযোগ রয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়। এসবের বাইরেও প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে সেচ্ছচারিতা, ঘুষ গ্রহণ আর নারী কেলেঙ্কারিরও অভিযোগ। সব মিলিয়ে পুরো বিআইডব্লিউটিএ প্রতিষ্ঠানই একটি দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় রূপ নিয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে বিআইডব্লিইউটিএ কর্তৃপক্ষের দাবি, ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ নদী খনন ও ড্রেজিং কার্যক্রম ঘিরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রেজিং শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক এলাকায় আবারও নাব্য সংকট দেখা দেয়। ফলে একই এলাকায় বারবার ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হয় এবং সরকারি ব্যয় বাড়ে। তাদের মতে, কোথায় কতটুকু ড্রেজিং হয়েছে, উত্তোলিত বালুর ব্যবহার এবং কাজের কার্যকারিতা নিয়মিত স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাই এসব অঘটন লাগাতার ঘটে চলেছে। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন নদীবন্দর, লঞ্চঘাট ও ইজারা ব্যবস্থাপনাও অভিযোগের বাইরে নয়। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ইজারা প্রদান, দোকান বরাদ্দ এবং বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য কমবে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর নিষ্পত্তি দৃশ্যমান হয় না।
নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব ও তদবিরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আহমেদ রানা নামে একজন ঠিকাদার বলেন, কার্যাদেশ পাইয়ে দিতে ঘুষ ছাড়া কোনো কথাই বলেন না এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তাদের একটাই কথা, ‘ঘুষ দাও কাজ নাও আর কাজ শেষে ঘুষ দাও বিল নাও।’ এর বাইরে তাদের আর কোনো ভাষা নেই। একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ে অভিযানও চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই।
সম্প্রতি নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও অসদাচরণের মতো গুরুতর অভিযোগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর আগে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (মেরিন) মো. আব্দুর রহিম এবং উপপরিচালক মো. ওবায়দুল করিম খানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ড্রেজার ও সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে দুদক। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগে সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য জিল্লুর রহমান, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেকসহ বর্তমানে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তাও আছেন। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স, এনডিএ ও এমএম বিল্ডার্সের মালিকদের বিরুদ্ধেও যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরস্পরের সহযোগিতায় নিয়োগ বাণিজ্য, কার্গো ভ্যাসেলের লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ ইস্যুতে ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুদকের সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াত এ বিষয়ে জানান, প্রকল্পটি সংশোধন করে নতুনভাবে বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক সূত্রমতে, ২০১৮ সালে বিআইডব্লিউটিএ ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এতে ৩৫টি ড্রেজার, ১৬১টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ, তিনটি ড্রেজার বেজ এবং একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। একই সঙ্গে ব্যয়ও বাড়িয়ে ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। দুই দফা মেয়াদ বাড়লেও দীর্ঘ আট বছরে প্রকল্পের অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রকল্পের মোট ৬১টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩৪টি প্যাকেজের কাজ এখনো ঝুলে আছে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে কয়েকটি প্যাকেজের চুক্তিমূল্য প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি ধরা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্যাকেজ-৭, ৮, ১০ ও ১২ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আলী আজগর ফকির দুদকে অভিযোগ দায়ের করেন। পরে দুদক প্রকল্পটির দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন নথিপত্র তলব করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত কার্যালয়ে তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএর অধীনে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। দুদক ও মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা অভিযোগের সূত্রমতে, ওই দপ্তরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। তারা আগে থেকেই নিজেদের মনোনীত প্রার্থীদের কাছে পরীক্ষার প্রশ্ন পৌঁছে দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় পাস করিয়ে নেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ায় এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগে বলা হয়, গত ১৬ মে মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বালক-বালিকা শাখা) এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পরীক্ষা চলার কথা থাকলেও পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মনোনীত প্রার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দেয়। পরে প্রশ্নের উত্তরপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়।
তবে নিয়োগ কমিটির দাবি, পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব তাদের নয়; এটি পরিচালনা করেছে মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটি। যদিও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখাচ্ছে এবং অভিযোগগুলো আমলে নিতে অনাগ্রহী।
ভুক্তভোগীরা নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও নৌ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করে ১৯৯০ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা উত্তরপত্র, হাজিরা শিট, পরীক্ষার্থীদের স্বাক্ষর এবং পরীক্ষকদের স্বাক্ষর যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। একই ব্যক্তির হাতের লেখা একাধিক উত্তরপত্রে আছে কি না, উত্তরপত্রে পরীক্ষার্থীর স্বাক্ষর মিলছে কি না, তা তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক মো. সাজেদুর রহমান বলেন, পরীক্ষা নিয়েছে মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটি। খাতা মূল্যায়নও তারাই করেছে। তাদের হাতে প্রশ্নপত্র ছিল না, তাই প্রশ্নফাঁসের সুযোগ নেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন