গতকাল দিনভর মনে পড়েছে আমার হারিয়ে যাওয়া গড়ানের পাখি সেই বন্ধুটির কথা। শুধু কাল বলব না। প্রায়ই মনে পড়ে। কাল প্রয়াণ দিবসের কারণে আরও বেশি করে মনে পড়েছে। মাত্র ছয় বছরের সিনিয়র ছিল এন্ড্রু কিশোর। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কখনো সেই সিনিয়র-জুনিয়রের দূরত্ব ছিল না। সম্পর্কটা ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের। ‘আপনি’ নয়, ‘তুই’Ñ এই সম্বোধনেই ছিল আমাদের আন্তরিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
দেখা হলেই রাজশাহীর সেই চেনা আঞ্চলিক টানে মজা করে কথা বলত। বলত, মামুর বেটা, কেমন আছিস? তার মুখে সেই ভাষা শুনলেই চারপাশ যেন অন্যরকম হয়ে উঠত। প্রাণখোলা হাসি, নির্মল রসবোধ আর একেবারে শিশুর মতো সরল একটি মানুষ ছিল সে। খ্যাতির চূড়ায় থেকেও যার ভেতরে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না।
এম এ কাসেম পরিচালিত ‘সাধনা’ ও ‘দ্বীন দুনিয়া’ সিনেমায় আমার লেখা দুটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিল সে। একজন গীতিকারের জন্য নিজের লেখা গান এমন একজন শিল্পীর কণ্ঠে প্রাণ পেলে যে আনন্দ জন্মায়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজও সেই গান শুনলে কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে মানুষটার মুখটাও ভেসে ওঠে।
কত রাত যে এক চাদরের নিচে দুজনে হেঁটেছি, তার হিসাব নেই। শহর তখন ঘুমিয়ে থাকত, আর আমরা গল্পে গল্পে হারিয়ে যেতাম। বারী স্টুডিও, পপুলার স্টুডিওÑ এসব ছিল শুধু কাজের জায়গা নয়, আমাদের অসংখ্য আড্ডা, হাসি আর স্বপ্নের সাক্ষী। কত স্মৃতি, কত গল্প, কত অমলিন মুহূর্তÑ সবই আজ সময়ের অ্যালবামে বন্দি।
আজ সেই বন্ধুর চলে যাওয়ার দিন। সময় ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে, কিন্তু কিছু শূন্যতা কোনোদিন পুরোনো হয় না। কিছু মানুষের অনুপস্থিতি সময়কে হার মানায়। এন্ড্রু কিশোর আমার কাছে তেমনই একজনÑ শুধু বাংলাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি আমার জীবনের এক টুকরো উজ্জ্বল সময়, এক অকৃত্রিম বন্ধু।
কত গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি? উত্তরটা নিজেও অবশ্য জানতেন না। তবে অনেকের মতে, সংখ্যাটা ১৫ হাজারের কম নয়! এর মধ্যে জনপ্রিয় গান কতগুলো? সেটার সংখ্যাও এত যে, অনেক শিল্পীর গোটা ক্যারিয়ারেও তত গান নেই। এমন নানা কারণেই তাকে বলা হয় ‘প্লেব্যাক সম্রাট’।
এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীত ভা-ার। তার গাওয়া জনপ্রিয় কিছু গান ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’ প্রভৃতি।
এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীত ভা-ার। তার গাওয়া জনপ্রিয় কিছু গান আজও মনে গেঁথে আছে। ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, সবাই তো ভালোবাসা চায়, ও আমার দেশের মাটি, আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা। বন্ধু আমার সেই ডানাটাই যেন ভেঙে পালিয়ে গেছে।
বন্ধু, তুই নেইÑ এ কথাটা আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠবে, ওপাশ থেকে রাজশাহীর টানে বলবি, ‘মামুর বেটা, কেমন আছিস?’ তারপর আবার প্রাণ খুলে হাসবি।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু কণ্ঠ কখনো মরে না। কিছু বন্ধুত্বও শেষ হয় না। তুই তেমনইÑ গানে, স্মৃতিতে, আর বুকের গভীরে আজীবন বেঁচে থাকবি। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন