আদালতে চাঞ্চল্যকর অনেক মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মামলা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকেট (তালিকা বা রেকর্ড) গায়েব হওয়া অথবা নষ্ট হওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে অতীতে। আদালতের সেরেস্তায় থাকা কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব ঘটনায় প্রায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন আদালতÑ এমন নজিরও রয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে বিচারাধীন মামলার ডকেট কোর্ট পুলিশের হেফাজতে থাকলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এক আদেশে ডকেট সংরক্ষণের দায়িত্ব চলে যায় আদালতের সেরেস্তা শাখায়। দীর্ঘদিন পর সেই দায়িত্ব আবার ফিরে পেয়েছে আদালত পুলিশ। এখন থেকে আদালত পুলিশের হেফাজতে থাকবে বিচারাধীন যেকোনো মামলার সব ধরনের ডকেট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে এখন থেকে বিচারাধীন মামলার ডকেট সংরক্ষণে বা গোপনীয়তা রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আদালত পুলিশের কাছে বিচারাধীন মামলার ডকেটের দায়িত্ব ফিরে আসায় যেমন নথিপত্রের সুরক্ষা তৈরি হয়েছে, তেমনি নথিপত্র বিনষ্ট বা গায়েব হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পন্নের সুযোগও তৈরি হলো।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে আদালতে বিচারাধীন মামলার ডকেটিংয়ের দায়িত্ব ছিল কোর্ট পুলিশের। দেশ স্বাধীনের পরও পুলিশ এ দায়িত্ব পালন করে আসছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইচ্ছাতে এক নির্বাহী আদেশে সেই ক্ষমতা চলে যায় আদালতের সেরেস্তা শাখায়। মামলা ডকেটিংয়ের দায়িত্বে থাকতেন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এবং সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটররা (এপিপি)। ফলে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি বা রায়ের ক্ষেত্রে নথিপত্র যথাযথ না থাকার কারণে সাজার হার কমে যেতে শুরু করে। বিষয়টি অনুভব করার পর ২০১৪ সালে পুলিশের পক্ষ থেকে বিচারাধীন মামলার ডকেটিংয়ের দায়িত্ব কোর্ট পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারাধীন মামলার ডকেটিংয়ের জন্য পুলিশের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে মামলার ডকেট আরও ভালোভাবে সংরক্ষিত রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম সাহাদাৎ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল) অনুযায়ী বিচারাধীন মামলার নথিপত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা কোর্ট পুলিশের কাছেই রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর নির্বাহী আদেশে পিপি বা এপিপিদের সেই দায়িত্ব দেওয়া হলেও পিআরবি পরিবর্তন হয়নি। এতদিন নির্বাহী আদেশে আদালতের বিচারাধীন মামলার নথিপত্র পিপি ও এপিপিদের মাধ্যমে আদালতের সেরেস্তা শাখায় সংরক্ষিত ছিল। এখন সেই দায়িত্ব ফিরে পেয়েছে পুলিশ।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গত রোববার জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, জিপি-পিপি শাখা থেকে আগে জারি করা মামলার ডকেট সংরক্ষণ সংক্রান্ত নির্দেশনা বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিচারাধীন মামলার ডকেট এখন থেকে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তার হেফাজতে সংরক্ষণ করতে হবে। পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ বা শুনানির জন্য নির্ধারিত তারিখের আগে সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে কেস ডকেট হস্তান্তর করবেন কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তা। সাক্ষ্যগ্রহণ বা শুনানি শেষ হওয়ার পর সেই ডকেট পুনরায় গ্রহণ করে নিজের হেফাজতে সংরক্ষণ করবেন তিনি। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটরকে প্রচলিত বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণ এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিচারাধীন মামলার ডকেট আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, শুনানির অগ্রগতি, আদালতের বিভিন্ন আদেশ, প্রসিকিউশনের প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাগজপত্র এই ডকেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে ডকেটের নিরাপদ সংরক্ষণ ও নির্ধারিত সময়ে আদালতে উপস্থাপন বিচারিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এতদিন জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার ডকেট আদালতের সেরেস্তা শাখায় সংরক্ষণ করা হতো। অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন মামলার ডকেট সংশ্লিষ্ট ‘সেকশন’ নামে পরিচিত প্রশাসনিক শাখায় সংরক্ষিত থাকত। নতুন পরিপত্র কার্যকর হওয়ার পর বিচারাধীন মামলার ডকেট সংরক্ষণের দায়িত্ব কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ন্যস্ত হবে।
আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে হাজতিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিচারাধীন আসামিদের আদালতে হাজির করা, আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে তারা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। নতুন নির্দেশনার ফলে তাদের দায়িত্বের পরিধি আরও বাড়বে। এখন বিচারাধীন মামলার ডকেটের নিরাপদ সংরক্ষণ, যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে হস্তান্তর এবং শুনানি শেষে পুনরায় গ্রহণের দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তাবে।
পরিপত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ডকেট হস্তান্তর ও গ্রহণের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ কোন কর্মকর্তা কখন কোন মামলার ডকেট গ্রহণ বা হস্তান্তর করেছেন, তার লিখিত তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও পাবলিক প্রসিকিউটরকে সর্বদা পারস্পরিক সমন্বয় ও সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ করতে বলা হয়েছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিচারাধীন মামলার ডকেট আদালতের অত্যন্ত সংবেদনশীল নথি। এসব নথিতে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য, জব্দ তালিকা, আলামতের বিবরণ, আদালতের আদেশ এবং মামলার অগ্রগতির বিভিন্ন তথ্য থাকে। ফলে ডকেটের নিরাপদ সংরক্ষণ এবং যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন নিশ্চিত করা বিচারিক কার্যক্রম নির্বিঘœ রাখার জন্য অপরিহার্য।
তারা আরও বলেন, নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য আদালত, কোর্ট পুলিশ ও প্রসিকিউশনÑ এই তিন পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে যেসব আদালতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলার শুনানি হয়, সেখানে ডকেট গ্রহণ, হস্তান্তর ও সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে নতুন ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ পরিবর্তনের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা উদ্দেশ্যের কথা পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। আদালত প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচারাধীন মামলার ডকেট সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বণ্টনে একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিপত্র কার্যকর হওয়ার পর দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার ডকেট সংরক্ষণ, হস্তান্তর ও গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন এই পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে। ফলে আদালতের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন