× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ফারুক আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:৪৪ এএম

রক্তস্নাত জুলাই

ভয়ংকর ও আশাব্যঞ্জক দিনগুলো

ফারুক আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:৪৪ এএম

ভয়ংকর ও আশাব্যঞ্জক দিনগুলো

বৈষম্য, প্রতিরোধ ও স্বপ্নÑ তিন শব্দে বাঁধা ছিল ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের প্রত্যাশায় রাজপথে নেমে আসা লাখো জনতার আন্দোলনে সৃষ্টি হয়েছিল বিজয়ের উচ্ছ্বাস।  অন্যদিকে জুলাইজুড়ে ছিল প্রাণহানি, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার গভীর ক্ষত। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব রিফাত রশীদ বলেন, ‘জুলাইয়ের দিনগুলো ছিল রোমাঞ্চকর, ভয়ংকর ও আশাব্যঞ্জক।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল একটি গণতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থান। ৩৬ দিনের এই আন্দোলনে অগণিত প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। ঐতিহাসিক এই বিজয় সূচিত হয়, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, যা তৎকালীন সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আরও প্রবল হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। দেড় হাজারের অধিক মানুষের হত্যার পরিপ্রক্ষিতে বিগত প্রায় ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশকে শাসন করার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ওই দিন, জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।

উল্লেখ্য, আন্দোলনের শুরুর মাত্র ৩ দিন পর বাংলা ব্লকেডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকা মহানগরী। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। আজকের এইদিনে, শিক্ষার্থীরা ঢাকার ১১টি স্থানে অবরোধ কর্মসূচি, ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, ছয়টি মহাসড়কসহ তিনটি স্পটে রেলপথ অবরোধের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের সংযোগ বন্ধ করে দেয়।

গণঅভুত্থানের শুরুর দিনগুলির স্মৃতিচারণ করে জুলাই গণআন্দোলনের সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব রিফাত রশীদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাইয়ের দিনগুলোকে ব্যাখ্যা করতে হলে তিনটি শব্দ প্রয়োজন হবেÑ রোমাঞ্চকর, ভয়ংকর ও আশাব্যঞ্জক। এই তিনটির সমন্বয়েই ছিল জুলাই। সেই সময় আমরা প্রচ- পরিশ্রম করেছি, তবে সামনে ছিল একটি স্বপ্নÑ নতুন বাংলাদেশ গড়া। শুরুতে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কোটা সংস্কার, যা ২০১৮ সালের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। আমিও সেই আন্দোলনে রাজপথে ছিলাম, হামলার শিকার হয়েছি। সেই অর্জনকে রক্ষা করার লক্ষ্যেই আমরা আন্দোলন চালিয়ে গেছি। একপর্যায়ে সেটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আল্লাহর রহমতে সেই আন্দোলনের নেতৃত্বের অংশ হতে পেরেছি। দিনগুলো ছিল উৎকণ্ঠার। তবে মৃত্যুভয় আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে আমার কাছে রাষ্ট্র সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে। এটি কোনো বক্তৃতার কথা নয়, বরং আমার বিশ্বাসের অংশ। আমার পরিবারও আমাকে সেই সমর্থন দিয়েছে। বিশেষ করে আমার মা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন নিখোঁজ ছিলাম, তখন আমার মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি প্রথম বলেছিলেন, আমার ছেলে বেঁচে থাকলে আমি খুশি। আর যদি না-ও বাঁচে, তবে যেন দেশের জন্য কিছু করে মারা যায়।’ এমন দোয়া আর দেশের মানুষের সমর্থন থাকলে ভয় পাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমরা দেখেছি, একজনকে গুলি করলে আরেকজন এগিয়ে এসেছে।’

‘আমার বিশ্বাস, নেতৃত্ব সৎ হলে কর্মীরাও সৎ থাকে। নেতৃত্ব যদি জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে কর্মীরাও সেই সাহস পায়। আমরা নিজেরা জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম বলেই রাজপথের সামনের সারির কর্মীরাও সাহস নিয়ে লড়াই করেছেন’, বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল শহিদদের রক্ত। যখন আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ অনেকে শহিদ হয়েছেন, তখন নিজের কথা ভাবার সুযোগ ছিল না। প্রতিটি কর্মসূচি ঘোষণার অর্থ ছিল আরও প্রাণহানির আশঙ্কা। তাই একটাই চিন্তা ছিলÑ আন্দোলনকে কীভাবে সফল করা যায়। শহিদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল।’

জুলাইয়ের সম্মুখসারির আরেক এক যোদ্ধা জান্নাত তাবাসসুম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী জান্নাত সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা তুলে ধরে বলেন, ‘বিশেষ করে নারীদের সংগ্রাম এবং ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আসা ভয়ভীতিÑ সব মিলিয়ে সময়টা ছিল ভীষণ কঠিন।’ তবু পিছু না হটে লড়াই করে গেছেন তারা।

তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন প্রথমে গণআন্দোলন ছিল না। এটা ছিল ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন। স্বাভাবিকভাবেই দেখা যেত ভার্সিটিতে ভর্তির সময় কোটা প্রথা বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে অনেকে ভালো সাবজেক্ট পেয়ে যাচ্ছে। একই পদ্ধতি বিসিএসের ক্ষেত্রেও। কোটার সুযোগে কেউ কেউ খুব সহজে জব পেয়ে যাচ্ছে। যার সিরিয়াল আগে সে জব পাচ্ছে না। এভাবে আসলে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না।’ 

আন্দোলন পরবর্তী অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের পরের সময়টা আরও কঠিন। এমন মানসিক অবস্থা তৈরি হয় যে আমি সুইসাইড করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। ৫ আগস্টের আগে সমন্বয়কদের অনেক কদর ছিল, কিন্তু তারপরে সেই সম্মান ক্রমেই কমতে থাকে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেকরা বলেছেন, দেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার বিস্ফোরণ। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল কোনো একক রাজনৈতিক দলের আহ্বানে নয়, বরং নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অধিকার, ভোটের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে। এই অভ্যুত্থান ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার চুক্তি ভেঙে পড়ে নতুন করে লেখার দাবি উঠেছিল।

তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ এবং অবিভক্ত পাকিস্তানের জনগণ আরও দুটি বড় গণঅভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেছে। সে অভ্যুত্থান দুটির মধ্যে একটি ছিল স্বাধীনতার দাবি আর একটি ছিল স্বৈরশাসক উৎখাতের আন্দোলন। স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে আন্দোলন-সংগ্রাম হয় স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ১৯৮২ সাল থেকে। বলা যায়, সেই আন্দোলনও ছিল শহরকেন্দ্রিক। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন এরশাদের পতন ঘটেছিল অন্যদিকে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু এবং উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে নির্বাচন এই চক্রের মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা একটু ভিন্ন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে জনগণের ঘাড়ের ওপরে বসে থাকা একটি ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রের সব সংস্থাকে ধ্বংস করে ফেলেছিল। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, মানুষ আদালতের কাছে যেতেও ভয় পেত। ফলে মানুষ ছিল ক্ষুব্ধÑ যার ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক, কিন্তু কয়েকটি মৌলিক দাবিতে তা স্পষ্টভাবে কেন্দ্রীভূত।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!