সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় দুই বছর পার হলেও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত প্রত্যাহার হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে। সর্বশেষ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় এ বন্দর দিয়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার টন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, বেকার হয়ে পড়েছেন কর্মচারীরা। একই সঙ্গে বেনাপোল ও পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় পরিবহন, গুদাম, হ্যান্ডলিং শ্রমিক এবং ব্যবসায়ও নেমে এসেছে স্থবিরতা।
বেনাপোল বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ১৩ কর্মদিবসে ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তিন হাজার ৩৮টি ভারতীয় ট্রাক। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৫৩ ট্রাক পণ্য। আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হতো। বর্তমানে আমদানি কমে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাক এবং রপ্তানি কমে ২০ থেকে ১০০ ট্রাক হয়েছে।
বন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭২ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় তিন লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আরও কমে দাঁড়ায় এক লাখ ৯২ হাজার ৮২ টনে। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে রপ্তানি কমেছে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার টন। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল পাট, পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন ও মাছ। মূলত দুই দেশের সরকারের বিধিনিষেধের কারণে এসব পণ্যের রপ্তানি আগের তুলনায় প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ব্যবসায়ীদের মতে, বৈশি^ক মন্দা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারতের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নেমেছে। এতে বেনাপোলের কয়েকশ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মালিক, কর্মচারী এবং বন্দর এলাকায় কর্মরত এক হাজারের বেশি শ্রমিক গভীর সংকটে পড়েছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারত সরকারের আরোপিত শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার কারণেই আমদানি-রপ্তানিতে এ বৈষম্য তৈরি হয়েছে। স্থলপথে যেসব পণ্যের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করা হোক।
বাণিজ্য-সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল থেকে দেশটির আকাশপথ ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি পণ্যের স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের দাবির পর দেশীয় শিল্প রক্ষার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সরকার স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। এরপর একই বছরের ১৭ মে ভারত সরকার গার্মেন্টস, তৈরি পোশাক, তুলা, প্লাস্টিক, কাঠের তৈরি আসবাবপত্র ও ফলজাতীয় পণ্য স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ করে। ২৬ জুন ভারত তার স্থলপথ ব্যবহার করে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিও বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ ১১ আগস্ট নতুন করে স্থলবন্দর ব্যবহার করে বস্ত্র ও পাটজাত চার ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় দেশটি। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাট বা অন্য উদ্ভিজ্জ তন্তু থেকে উৎপাদিত কাপড়, পাটের তৈরি দড়ি, রশি ও সুতলি, অন্য তন্তুর তৈরি দড়ি, রশি ও সুতলি এবং পাটের বস্তা ও ব্যাগ।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ভারত এসব নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত প্রত্যাহার করেনি। ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।’
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ‘ভারত বাধা হয়ে দাঁড়ালে বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং একই সঙ্গে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।’
বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ ছাড়া স্থলপথে যেসব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।’
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, ‘এ বন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সিংহভাগ বাণিজ্য সম্পন্ন হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পণ্যবাহী ট্রাকের আসা-যাওয়া কমেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাণিজ্য কমে গেছে। বাণিজ্যের পরিমাণ কমে আসায় বন্দর দিয়ে সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়েছে। এতে শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতেরও ক্ষতি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই দেশের পক্ষ থেকে আরোপিত নানা বিধিনিষেধই বাণিজ্যে এ ধসের মূল কারণ। রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন