× UCB Sticker Card
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সনেট দেব, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

সনেট দেব, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

কল্পনা করুন, আপনি একটি মুদি দোকানে ঢুকেছেন কেনাকাটা করতে। কাউন্টারে চোখ পড়তেই দেখলেন একগাদা কিউআর কোড ঝুলছেÑ একটি বিকাশের, একটি নগদের, একটি রকেটের, আবার একটি ব্যাংকের নিজস্ব কোড। পেমেন্ট করার আগে আপনাকে খুঁজে বের করতে হচ্ছে, আপনার মোবাইলে থাকা অ্যাপটির সঙ্গে কোন কোডটি মিলবে। মিল না হলে হাতে টাকা থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল উপায়ে বিল মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার এই বিভক্তিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এই সমস্যার সমাধানেই বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এসেছে একটি অভিন্ন, সর্বজনীন পেমেন্ট মাধ্যমÑ ‘বাংলা কিউআর’। ১ জুলাই থেকে সারা দেশে এই কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১ এপ্রিল একটি নির্দেশনা জারি করে দেশের সব তপশিলি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের ৩০ জুনের মধ্যে নিজস্ব কিউআর কোড সরিয়ে বাংলা কিউআর নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়। ৩০ জুনের পর থেকে পৃথক পৃথক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআর ব্যবহারের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং ১ জুলাই থেকে এই নির্দেশনা পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানÑশপিং মল, সুপারশপ, ছোট দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাতের ব্যবসায়ী পর্যন্তÑসবার জন্য দোকানে বাংলা কিউআর কোড প্রদর্শন ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে শুধু সর্বজনীন বাংলা কিউআরই চলবে; কেউ যদি এখনো আলাদা কিউআর ব্যবহার করেন এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলা কিউআর চালুর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের ধরনে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। আগে দোকানে শুধু বিকাশের কিউআর থাকলে নগদ বা অন্য কোনো ব্যাংকের গ্রাহক সেখানে ডিজিটাল উপায়ে বিল মেটাতে পারতেন না। এখন একটিমাত্র কোড দিয়ে যেকোনো অ্যাপ থেকেই পেমেন্ট করা যাবে। কেনাকাটায় যাওয়ার সময় মোটা অঙ্কের নোট বা মানিব্যাগ বহনের প্রয়োজন কমে যাবে। খুচরা টাকার সমস্যা বা ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে বাকি টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করারও দরকার হবে না। পকেটমার হওয়া বা টাকা হারানোর ঝুঁকি কমবে, আর প্রতিটি লেনদেনের সঙ্গে সঙ্গেই মোবাইলে কনফার্মেশন মেসেজ চলে আসায় গ্রাহকরা তাদের খরচের হিসাবও নিখুঁতভাবে রাখতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই ব্যবস্থায় প্রতি এক হাজার টাকা লেনদেনে গ্রাহকের সর্বোচ্চ খরচ হবে প্রায় ১১ টাকা ৫০ পয়সা, যা প্রচলিত অনেক ডিজিটাল লেনদেন পদ্ধতির তুলনায় বেশ প্রতিযোগিতামূলক। এই উদ্যোগ চালু হওয়ার খবরে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে একধরনের স্বস্তি ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। একজন বেসরকারি চাকরিজীবী গ্রাহক জানান, বাংলা কিউআর প্রতিটি দোকানে চালু হলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন থাকবে না, সরাসরি অ্যাপ থেকেই পেমেন্ট করা যাবে। তবে সবাই যে এখনই এই সুবিধা নিতে প্রস্তুত, তা নয়। অনেকে জানিয়েছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারেই অনভ্যস্ত হওয়ায় তাদের পক্ষে বাংলা কিউআরে পেমেন্ট করা কঠিন হবে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরিতে আরও সময় ও প্রচারণা প্রয়োজন হবে।

বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছেন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা। আগে ছোট দোকানদারদের পক্ষে ব্যয়বহুল পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন কেনা বা তার রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু বাংলা কিউআর ব্যবহারের জন্য এমন কোনো ব্যয়বহুল যন্ত্রের প্রয়োজন নেইÑশুধু একটি কাগজে প্রিন্ট করা কোড দোকানে ঝুলিয়ে রাখলেই ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করা সম্ভব। এর ফলে ফুটপাতের চায়ের দোকান, ঝালমুড়ি বিক্রেতা, রিকশাচালক, গ্রামের মুদি দোকান কিংবা সবজি বিক্রেতাÑসবাই এখন ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আসতে পারবেন। দৈনিক ক্যাশ মেলানোর ঝামেলা এবং চুরির ঝুঁকিও অনেকটাই কমে যাবে, কারণ লেনদেনের টাকা সরাসরি ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে জমা হয়ে যাবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং লেনদেনের রেকর্ড তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একজন সাবেক ব্যাংকিং কর্মকর্তার মতে, সবাই এগিয়ে এলে একসময় ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ব্যবসাও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যার ফলে কাগুজে নোট ও মানিব্যাগের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে।

তত্ত্বগতভাবে বাংলা কিউআর যতটা সহজ শোনায়, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে কিছুটা জটিল। ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক করা হলেও শুরুর দিকে বাস্তবায়নে বেশ কিছু বাধার মুখে পড়েছে এই উদ্যোগ। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, শপিং মল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই তখনো আগের মতো বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের পৃথক পৃথক কিউআর কোডই ব্যবহার হচ্ছিল। অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বাংলা কিউআর সম্পর্কে তারা স্পষ্ট ধারণাই পাননি এবং সরকারি বা ব্যাংকের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রচারণা কিংবা প্রশিক্ষণও পাননি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চাকাক্সক্ষী এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন শুরুতে কিছুটা ধীরগতির মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই চলবে নাÑ এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি, ব্যবসায়ীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি।

শুরুর দিকে ধীরগতি থাকলেও পরিসংখ্যান বলছে, বাংলা কিউআরের প্রতি মানুষের সাড়া মোটেই খারাপ নয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পুরোদমে বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রথম দুই দিনেই এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় ২২ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে মোট ৭৭ হাজার ১৬৫টি সফল লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে বলে ২ জুলাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট যে, যথাযথ প্রচারণা ও সহায়তা পেলে অল্প সময়েই এই ব্যবস্থা জনপ্রিয়তা পেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগে কোনো দোকানে শুধু বিকাশের কিউআর থাকলে নগদ বা অন্য ব্যাংকের গ্রাহক সেখানে ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারতেন না, কিন্তু এখন বাংলা কিউআর থাকলে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করেই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, বাংলা কিউআর সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষকে দ্রুত এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করে তুলতে লেনদেন ব্যয়ের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজে বহন করার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সতর্ক করে বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর সরবরাহ করবে না, তারা প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়বে, আর যারা নিজেদের কিউআর নিয়ে শহর থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে, তারাই বাজারে এগিয়ে থাকবে।

একাধিক আলাদা কিউআর কোডের জটিলতা থেকে একটিমাত্র সর্বজনীন কোডে উত্তরণÑ এই যাত্রা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাংলা কিউআর শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধাই দিচ্ছে না, বরং দেশের কোটি কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করছে। শুরুর দিকের ধীরগতি ও সচেতনতার ঘাটতি স্বাভাবিক হলেও, প্রথম দুই দিনের লেনদেনের পরিসংখ্যান আশার আলো দেখাচ্ছে। এখন প্রয়োজন কেবল ধারাবাহিক প্রচারণা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাÑ যা এই উদ্যোগকে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ক্যাশলেস ভবিষ্যতের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!