× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ফারুক আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

এমপিদের কর্মকাণ্ডে জামায়াতের অস্বস্তি 

ফারুক আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

একের পর এক বিতর্কে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংসদে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে অন্তত ছয় সংসদ সদস্যকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সংসদে বেফাঁস মন্তব্য, ব্যক্তিগত সহকারীদের কর্মকাণ্ড, সর্বশেষ এক এমপির সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জামায়াতের। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের পরও বিতর্ক থামানোর চ্যালেঞ্জে তারা।

এদিকে জামায়াত নেতাদের মানুষ অপেক্ষাকৃত অনেক সৎ মনে করেন। একই সঙ্গে তারা ধর্মকর্মে মনোযোগী হওয়ায় দেশের একটা বিশাল অংশ পছন্দ করে তাদের। তবে জামায়াত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধরণায় বড় ধাক্কা খেল সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) থেকে নির্বাচিত জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর। যদিও এ বিষয়ে দলটি শক্ত অবস্থান স্পষ্ট করেছে। গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে তার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। 

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো চিঠির ব্যাপারে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, সম্প্রতি গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্ত পরিচালনা করা হয়। তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানানো হয়েছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যদি সংগঠনের গঠনতন্ত্রে বর্ণিত বিধি লঙ্ঘন করে এবং নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায় অথবা সংগঠনের সুনাম ও মর্যাদা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন তার সদস্য পদ তো বাতিল হবেই। সংগঠন থেকে বহিষ্কার করারও বিধান আছে। সদস্য পদ বাতিল হলে সংগঠনে সে থেকে যাবে। তবে বহিষ্কার মানে সংগঠন থেকেই বাদ।

নজরুল সংসদ সদস্য পদ হারাবেন কি না এ বিষয়ে সংসদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, গাজী নজরুল ইসলাম দল থেকে বহিষ্কার হলেও তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না। নৈতিক স্খলনজনিত কোনো বিষয় যদি সংসদের ইনকোয়ারি কমিটিতে প্রমাণিত হয়, তাহলে তার পদ যেতে পারে। এটার জন্যও সংসদীয় তদন্ত লাগবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, দলের নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করলে সাধারণত দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু সংসদ সদস্য পদ হারাবে তখনই, যখন কেউ দলের বিপক্ষে সংসদে ভোট দেয় অথবা পদত্যাগ করে। এ ছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ফৌজদারি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারো যদি দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হয়, তখন। তবে এখানে একটা অস্পষ্টতা আছে। 

এদিকে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে যত আসন পেয়েছে, তা আগে পায়নি দলটি। এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এককভাবে ৬৮টি সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছেন। জামায়াতসহ তার নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখছে। দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস না পেরোতে সংসদের ভেতরে-বাইরে দলীয় অন্তত ছয় সংসদ সদস্যের (এমপি) কার্যকলাপে বিরক্ত দলটির অনেক নেতা। 

এ বিষয়ে জামায়াত জোটের সংসদীয় সমন্বয়কারী ও দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কেউ অন্যায় করলে কোনো ছাড় নেই। অনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

গত ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার খুতবার আগে এক আলোচনায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেন। বক্তব্যে টুকুকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বক্তব্যটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। এ ঘটনায় গত ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির কর্নেল একটি মানহানির মামলা দায়ের করেন। 

বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন গত ৭ জুন সংসদের বাইরে থাকা রিপোর্টারদের সঙ্গে আমির হামজা বাজেট নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত। আরেকবার বলেন, বাজেট ৬ হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। আমির হামজা পরে জানান, তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া উচিত। মুখ ফসকে ৬ হাজার কোটি বলে ফেলেছেন। আমির হামজার বক্তব্যেও অস্বস্তিতে পড়েছিল তার দল। 

গত ১৭ জুন সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমান এপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চেয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনো ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে। এই পর্দা, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। এই বক্তব্যের কারণে প্রথমে সামাজিক মাধ্যম, পরে সরকারি দলের সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত।
গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াত ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই; চারজনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন; ১১ জনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা। পরে জানা যায়, এমপি মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে। তার বাবা জীবিত। এ বক্তব্যের কারণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। সামাজিক মাধ্যমে ট্রল হয়।

নড়াইল-২ (সদরের একাংশ ও লোহাগড়া) আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের (বাচ্চু) ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদান প্রদানের জন্য সচিবালয় থেকে অনুমোদিত তালিকার দুই জায়গায় তার এক মেয়ের নাম পাওয়া গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া আরও ছোট-বড় ঘটনায় বিব্রত হতে থাকে দলটি।

তবে সর্বশেষ সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় দেশে-বিদেশে। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি, তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।

যদিও সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণীর একটি জীবনবৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবুজ কালির কলমে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন নজরুল ইসলাম, যাতে তারিখ উল্লেখ আছে ২০২৬ সালের ২২ জুন। ওই জীবনবৃত্তান্তে তরুণীটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে। ভাইরাল হয়ে পড়া ওই জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী তরুণীটি ২০০৮ সালের ২২ মে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, ৭৭ বছর বয়েসি নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী ১৭ জুন বিয়ে হলে ওই দিন তরুণীটির বয়স ছিল ১৮ বছর ২৬ দিন।

গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদে জামায়াত দলীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছিলেন যে, নজরুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা।

জামায়াতের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি দলের সংসদ সদস্যের এমন কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে যেন নেতিবাচক মনোভাব তৈরি না করে, সে জন্য সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া  উচিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!