× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

ঢাকার বাসে শাস্তির যাত্রা

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ঢাকার নগর পরিবহনে প্রতিদিন যাতায়াত করে লাখো মানুষ। দীর্ঘ ভোগান্তি, বাড়তি ভাড়া আর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে প্রতিদিনই এক অন্যরকম শাস্তির মধ্য দিয়েই তাদের পৌঁছাতে হয় গন্তব্যে। কিন্তু এসব দেখার যেন কেউ নেই। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বছরে বছরে ভাড়া বাড়লেও সেবার মান বাড়ছে না নগর পরিবহনে।  

সকাল সাড়ে ৮টা। রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর। অফিসগামী মানুষের দীর্ঘ সারি। একের পর এক বাস এলেও অধিকাংশই থামে না। থামলেও দরজায় ঝুলছে যাত্রীরা। কোনো রকমে একটি বাসে উঠলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আব্দুল গফুর। গন্তব্য ফার্মগেট। ভাড়া দিতে গিয়ে শুনলেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে পাঁচ টাকা বেশি দিতে হবে। কারণ জানতে চাইতেই কন্ডাক্টরের জবাব, যেতে হলে এই ভাড়াই দিতে হবে। তিনি বলেন, সিটে বসতেই শুরু হলো আরেক দুর্ভোগ। হাঁটু ঠেকে আছে সামনের সিটে। শরীর সোজা করে বসার সুযোগ নেই। ছেঁড়া সিট থেকে বেরিয়ে আছে স্পঞ্জ। ধুলা-ময়লা জমে সিটের রং বদলে গেছে। জানালার কাচ ভাঙা, কোনোটি আবার আটকে আছে। বাসজুড়ে ঘাম, ধুলা, ডিজেলের ধোঁয়া আর বদ্ধ বাতাসের তীব্র গন্ধ। এরই মধ্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে প্রতিদিন। এ দৃশ্য কোনো একটি বাসের নয়, রাজধানীর অসংখ্য গণপরিবহনের নির্মম বাস্তবতা।

রাজধানীর মিরপুর, গাবতলী, ফার্মগেট, আগারগাঁও, শাহবাগ, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও সায়েদাবাদ এলাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস পর্যবেক্ষণ এবং যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। 
জানা গেছে, গত এক দশকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য খরচের অজুহাতে একাধিকবার বাসভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। প্রতিবারই যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ যাত্রীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। ভাড়া বাড়লেও সেবার মান একটুও বাড়েনি; বরং দুর্ভোগ বাড়ছে দিনে দিনে।

যাত্রীদের অভিযোগ, স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছ থেকে এখনো নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হয়। ‘ওয়েবিল’ হিসাবে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া নিষিদ্ধ থাকলেও নগরীর বিভিন্ন রুটে ওয়েবিল অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

এ ছাড়া অনেক বাসে ভাড়ার তালিকা থাকলেও তা কার্যকর নয়। প্রতিবাদ করলে কন্ডাক্টরের দুর্ব্যবহারও প্রতিদিনের ঘটনা। বুধবার সন্ধ্যায় কুড়িল বিশ্বরোড থেকে ভূইয়া পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন ফয়সাল আহমেদ নামে এক যাত্রী, যাবেন শ্যামলী শিশুমেলায়। এই দূরত্বে তার কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হয় ৪০ টাকা। এ নিয়ে বাগি¦তণ্ডা শুরু হয় কন্ডাক্টরের সঙ্গে। এরই মধ্যে বিজয় সরণি এলাকায় ওয়েবিল চেকার ওঠেন গাড়িতে। ওই যাত্রী তার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে তিনি পাল্টা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। নগর পরিবহনের বাসে যাত্রী নাজেহালের এ ধরনের ঘটনা প্রতিদিনের। 

একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আজিজুর রহমান বলেন, প্রতিদিন কয়েক টাকা করে বেশি দিলেও মাস শেষে সেটা বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। কিন্তু সেবার মান একটুও বাড়েনি।

সরেজমিন দেখা গেছে, অধিক যাত্রী পরিবহনের আশায় অনেক বাসে অতিরিক্ত আসন বসানো হয়েছে। এতে সিটের মাঝের জায়গা এতটাই কমে গেছে যে, স্বাভাবিকভাবে বসে থাকা কঠিন। বিশেষ করে লম্বা গড়নের যাত্রীদের হাঁটু সারাক্ষণ সামনের সিটে ঠেকে থাকে। দীর্ঘ সময় এভাবে যাতায়াতের কারণে কোমর, হাঁটু ও ঘাড়ের ব্যথায় ভোগার কথা জানিয়েছেন অনেকে।

পরিবহন ও দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামানের মতে, আসনের ন্যূনতম মান ও দূরত্ব নির্ধারণে কার্যকর তদারকি না থাকায় নগর পরিবহনে যাত্রীর স্বাচ্ছন্দ্য উপেক্ষিত হচ্ছে। এ ছাড়া অপরিচ্ছন্নতা রাজধানীর গণপরিবহনের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক বাসের সিট মাসের পর মাস পরিষ্কার করা হয় না। কোথাও ধুলার স্তর, কোথাও খাবারের উচ্ছিষ্ট, আবার কোথাও বমির পুরোনো দাগও দেখা যায়। ছেঁড়া সিটের ভেতরে জমে থাকে ময়লা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত জীবাণুমুক্ত না করলে বাস সংক্রামক রোগ ছড়ানোর বড় উৎসে পরিণত হতে পারে। ফ্লু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চর্মরোগ, ফাঙ্গাল সংক্রমণ ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ, অনেক বাস শুধু যাত্রীই বহন করছে না, বহন করছে অদৃশ্য রোগ-জীবাণুও। 

সূত্র জানায়, রাজধানীতে প্রতিদিন কয়েক হাজার বাস লাখো যাত্রী পরিবহন করছে। এই খাতে প্রতিদিন হাতবদল হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু সেই আয়ের কতটা যাত্রীসেবা উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, তার স্পষ্ট হিসাব নেই। যাত্রীদের অভিযোগ, বহর বাড়ানোর দিকে মালিকদের আগ্রহ থাকলেও পরিচ্ছন্নতা, আরামদায়ক আসন, শৃঙ্খলা ও যাত্রীবান্ধব সেবায় বিনিয়োগ তুলনামূলক কম।

এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি প্রতিটি গাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে। তবে বর্ষাকালে নগর পরিবহনে অপরিচ্ছন্নতা বেশি থাকে। ঘাম, ধুলোবালু এবং বৃষ্টির পানি মিলিয়ে সিটগুলো বসার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মালিকদের সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে পরিবহন পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছি।’ রংচটা গাড়ির বিষয়ে তিনি বলেন, ওয়ার্কশপে অনেক গাড়ি পড়ে আছে। বৃষ্টির কারণে এগুলো রং করা যাচ্ছে না। নগর পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে বলে দাবি করেন তিনি।  

তিনি আরও বলেন, পুরোনো অনেক বাস এখনো সড়কে চলাচল করছে। ধাপে ধাপে নতুন বাস যুক্ত করা হচ্ছে। সেবার মানোন্নয়নে মালিকদেরও আগ্রহ রয়েছে। তবে যানজট, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেস, রুট পারমিট ও কাগজপত্র যাচাই হলেও বাসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, আসনের মান, পরিচ্ছন্নতা কিংবা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি খুব কম। তাদের ভাষায়, একটি বাসের ফিটনেস শুধু ইঞ্জিন, ব্রেক বা টায়ারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যাত্রী যে পরিবেশে ভ্রমণ করছেন, সেটিও নিরাপত্তা ও সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাদের মতে, বাসের আসনের ন্যূনতম মান, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত জীবাণুমুক্তকরণ, নির্ধারিত ভাড়া নিশ্চিতকরণ এবং যাত্রী অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি বাসে দৃশ্যমান অভিযোগ নম্বর, কিউআর কোডভিত্তিক অভিযোগ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন চালু করা হলে সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. জাকির হোসেন বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রীসেবার মান ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে জনবল ও বাস্তবতার কারণে সব রুটে সব সময় নজরদারি সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গণপরিবহনে সেবার মান নিশ্চিত করতে মালিক সমিতি, বিআরটিএর পাশাপাশি যাত্রীদেরও প্রতিনিধি থাকতে হবে। আমরা এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো কর্ণপাত করা হচ্ছে না।   

পরিবহন বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন বাড়তি ভাড়া দিচ্ছে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে। কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে। বিনিময়ে তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়। একটি পরিচ্ছন্ন বাস, আরামদায়ক আসন, নির্ধারিত ভাড়া এবং সম্মানজনক ব্যবহার। একটি আধুনিক শহরের গণপরিবহন নাগরিক সেবার মানদণ্ড। কিন্তু ঢাকার বহু বাসে চড়লে এখনো মনে হয়, যাত্রী পরিবহন নয়, যেন ভোগান্তিকেই বহন করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ভাড়া বাড়ানোর সঙ্গে যদি সেবার মানোন্নয়ন বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে রাজধানীর লাখো মানুষের প্রতিদিনের এই শাস্তির যাত্রা আরও দীর্ঘ হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!