ভারত ভালো নেই- এ খবর নতুন নয়। মোদির গদিটাও নাকি একটু নড়ে উঠেছে। নতুন খবর হলো, এই কথাটা এখন এত বেশি শোনা যাচ্ছে যে, একদিন হয়তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বলবেন, ‘দেশবাসী, আপনারা দয়া করে একটু ভালো থাকুন। আমারও কাজ আছে!’ কিন্তু দেশবাসী ভালো থাকবে কী করে?
সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল খুললেই অশান্তি। টেলিভিশন খুললেই অশান্তি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই অশান্তি। বাজারে গেলে মূল্যস্ফীতি, রাস্তায় গেলে যানজট, রাজনীতিতে গেলে দলাদলি। এমনকি চায়ের দোকানেও এখন চায়ের চেয়ে বেশি গরম রাজনীতি। আগে চায়ের কাপে ঝড় উঠত। এখন ঝড় ওঠে টেলিভিশনের স্টুডিওতে। চায়ের কাপটা শুধু পাশে বসে থাকে- কখন যে কে ছুড়ে মারে, সেই ভয়ে!
ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোরও বোধহয় একটি নতুন মন্ত্র হয়েছে, ‘খবর কম, উত্তেজনা বেশি।’ একজন অ্যাংকর চিৎকার করছেন, ‘দেশ জানতে চাইছে, দোষী কে’, দশজন অতিথি একসঙ্গে চিৎকার করছেন। দেশ তখন টিভির সামনে বসে বলছে, ‘ভাই, আগে আপনারা একটু চুপ করুন। তারপর দেশকে জিজ্ঞেস করুন!’ কিন্তু চুপ করবেটা কে?
ভারতে এখন সবাই কথা বলছে। শুধু সাধারণ মানুষটি ছাড়া। কারণ সে কথা বলতে গেলে আগে হিসাব করে- কথাটা বললে চাকরি যাবে কি না, মামলা হবে কি না, প্রতিবেশী রাগ করবে কি না, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে ‘দেশদ্রোহী’ না ‘দেশপ্রেমিক’- কোন দলে ফেলা হবে! এই হলো নতুন ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য, মানুষ এখন মত প্রকাশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শিখছে।
আর রাজপথ? রাজপথ এখন গণতন্ত্রের একেবারে লাইভ স্টুডিও। সেখানে মিছিল আছে, স্লোগান আছে, পোস্টার আছে, পুলিশ আছে, ব্যারিকেড আছে; শুধু মাঝে মাঝে গণতন্ত্রটা কোথায় আছে, সেটাই খুঁজে পাওয়া যায় না! রাহুল গান্ধী রাস্তায় নামলেন, ব্যারিকেড। বিরোধী নেতারা মিছিল করলেন- পুলিশ। স্লোগান উঠল, আটক। নেতারা বললেন, ‘আমরা প্রতিবাদ করব।’ প্রশাসন বলল, ‘করুন, তবে একটু পাশে দাঁড়িয়ে।’ নেতারা বললেন, ‘পাশে কোথায়?’ প্রশাসন বলল, ‘যেখানে আমরা বলি!’ তারপর শুরু হলো গণতন্ত্রের সেই চিরাচরিত দৌড়। একদিকে নেতা, অন্যদিকে পুলিশ। মাঝখানে ক্যামেরা। ক্যামেরার পেছনে সাংবাদিক। আর টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা জনগণ ভাবছে, ‘এটা কি সংসদ, নাকি নতুন কোনো রিয়েলিটি শো?’
ভারতের রাজনীতিতে এখন মিছিলেরও ভাগ্য নির্ধারিত হয় পুলিশের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। মিছিল বের হওয়ার আগে নেতা বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক আন্দোলন হবে।’ পুলিশ বলে, ‘অবশ্যই হবে।’ নেতা খুশি হয়ে বলেন, ‘আপনারা আমাদের সমর্থন করছেন?’ পুলিশ বলে, ‘না, আপনাদের আটক করব।’ নেতা বলেন, ‘তাহলে আমরা গ্রেপ্তার হব।’ পুলিশ বলে, ‘ঠিক তাই।’ নেতা বলেন, ‘এটাই তো গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ!’ পুলিশ বলে, ‘আপনারা তো কণ্ঠ দিয়েই যাচ্ছেন!’ তারপর ক্যামেরার সামনে হাত ধরে নিয়ে যাওয়া হয় নেতাদের। কেউ স্লোগান দেন, কেউ হাত নাড়েন, কেউ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন চলবে।’ আর সাংবাদিকরা ছুটে যান মাইক্রোফোন নিয়ে, ‘স্যার, আপনাকে আটক করা হচ্ছে। আপনার অনুভূতি কী?’ নেতা বলেন, ‘গণতন্ত্র বিপন্ন।’ সাংবাদিক বলেন, ‘আর কিছু বলবেন?’ নেতা বলেন, ‘আন্দোলন চলবে।’ সাংবাদিক বলেন, ‘ধন্যবাদ।’ পরদিন খবরের শিরোনাম, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় ঐতিহাসিক মিছিল।’ গণতন্ত্র অবশ্য সেই খবরটি পড়ে কী ভাবল, তা জানা গেল না। কারণ গণতন্ত্রের নিজের বক্তব্য নেওয়ার জন্য কোনো মাইক্রোফোন কেউ এগিয়ে দেয়নি!
মোদির অবস্থাও সুবিধার নয়। তিনি যদি বলেন, ‘সব ঠিক আছে’, বিরোধীরা বলে, ‘কিছুই ঠিক নেই।’ তিনি যদি বলেন, ‘দেশ এগোচ্ছে’, বিরোধীরা প্রশ্ন করে, ‘কোন দিকে?’ তিনি যদি বলেন, ‘বিশ্বে ভারতের সম্মান বেড়েছে’, বিরোধীরা বলে, ‘দেশের ভেতরে মানুষ কেমন আছে?’ তিনি যদি চুপ থাকেন, তখন প্রশ্ন, ‘প্রধানমন্ত্রী চুপ কেন’ অর্থাৎ মোদির সামনে এখন এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে তিনি কথা বললে বিপদ, চুপ থাকলেও বিপদ। ভারতীয় রাজনীতিতে এটাকে বলা যায়- ‘বক্তব্য দিলেও প্যাঁচ, না দিলেও প্যাঁচ।’ তার ওপর চারদিকে এত রাজনৈতিক উত্তাপ যে, আবহাওয়া দপ্তরও হয়তো এক দিন বিজ্ঞপ্তি দেবে, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক গরম হাওয়া বইতে পারে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ, পাল্টা বিক্ষোভ, মিছিল, পাল্টা মিছিল এবং টেলিভিশন বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের রাজপথে দেখা গেলে নাগরিকদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে ক্যামেরা কাছে রাখা যেতে পারে।’
কিন্তু মানুষ ঘরে থাকলেই বা শান্তি কোথায়? ঘরে ঢুকলেই টিভি। টিভিতে বিতর্ক। বিতর্কে চিৎকার। চিৎকারে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের পর আবার চিৎকার। শেষে দর্শক টিভি বন্ধ করে ঘুমোতে গেলেন। ঠিক তখন মোবাইলে নোটিফিকেশন, ‘ব্রেকিং নিউজ!’ ঘুমও গেল। শান্তিও গেল।
এদিকে রাজনীতির বাজারে ‘দেশ বাঁচানোর’ লোকের অভাব নেই। সবাই দেশ বাঁচাতে প্রস্তুত। শুধু দেশটা কাকে দিয়ে বাঁচবে, সেটাই দেশ জানে না! একদল বলছে, ‘আমরাই আসল দেশপ্রেমিক।’ অন্যদল বলছে, ‘ওরা দেশপ্রেমিক নয়।’ তৃতীয় দল বলছে, ‘দুজনেই ভুল।’ চতুর্থ দল বলছে, ‘আমাদের ছাড়া দেশ চলবে না।’ দেশ তখন চুপ করে বলে, ‘আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছ, আমি কাকে চাই?’ এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য রাজনীতিতে খুব একটা জরুরি নয়। কারণ ভোটের আগে জনগণ গুরুত্বপূর্ণ, ভোটের পরে জনগণ পরিসংখ্যান। আর পরিসংখ্যান দিয়ে যে পেট ভরে না, সেটা অবশ্য সাধারণ মানুষই সবচেয়ে ভালো জানে। বাজারে গিয়ে একজন নাগরিক বললেন, ‘ভাই, সবজির দাম এত বেশি কেন?’ দোকানি বললেন, ‘দেশ এগোচ্ছে।’ নাগরিক বললেন, ‘কিন্তু আমার বাজারের ব্যাগ তো পিছিয়ে যাচ্ছে!’ দোকানি বললেন, ‘আপনি দেশবিরোধী কথা বলছেন!’ নাগরিক তৎক্ষণাৎ চুপ। এই হলো ভারতের নতুন অর্থনীতি- দাম নিয়ে প্রশ্ন করলে দেশপ্রেমের পরীক্ষা!
তবে মোদির সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়তো এই নয় যে, বিরোধীরা কী বলছে। আসল চিন্তা হলো, সাধারণ মানুষ কী ভাবছে। কারণ রাজনৈতিক সভায় মানুষ হাততালি দেয়। টেলিভিশনে মানুষ চিৎকার শোনে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ লাইক দেয়। রাজপথে মিছিল হলে কেউ স্লোগান দেয়, কেউ ব্যারিকেড টপকায়, কেউ আটক হয়, কেউ জামিনের কাগজ তৈরি করে। কিন্তু ভোটের বাক্সে মানুষ একেবারে চুপচাপ থাকে। সেই নীরবতার শব্দই সবচেয়ে ভয়ংকর। মোদির ‘মন কি বাত’ অনেক হয়েছে। এবার হয়তো দেশের ‘মন কী বলছে’ সেটা শোনার সময়। দেশ বলছে, ‘আমাদের একটু শান্তি দিন।’ কৃষক বলছে, ‘আমাদের ফসলের দাম দিন।’ বেকার বলছে, ‘আমাদের কাজ দিন।’ মধ্যবিত্ত বলছে, ‘আমাদের করের বোঝা একটু কমান।’ নারী বলছে, ‘আমাদের নিরাপত্তা দিন।’ সংখ্যালঘু বলছে, ‘আমাদের ভয় দেখাবেন না।’ আর সাধারণ নাগরিক বলছে, ‘দয়া করে আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবেন না।’
কিন্তু রাজনীতি বড় বিচিত্র জিনিস। সেখানে শান্তি যত কমে, উত্তেজনা তত বাড়ে। উত্তেজনা যত বাড়ে, ভোটের সম্ভাবনা তত বাড়ে। আর ভোট যত কাছে আসে, নেতাদের দেশপ্রেম তত বেড়ে যায়! তখন মিছিল আরও বড় হয়। স্লোগান আরও জোরে ওঠে। ব্যারিকেড আরও শক্ত হয়। পুলিশ আরও প্রস্তুত থাকে। নেতারা আরও আবেগী হন। ক্যামেরা আরও কাছে যায়।
আর জনগণ? সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে, ‘ভাই, আপনারা মিছিল করুন, স্লোগান দিন, চাইলে একে অপরকে আটকও করুন। কিন্তু বাজারে গিয়ে একবার আমার সঙ্গে দাঁড়াবেন? আলুর দামটা একটু কমাতে পারবেন?’ কেউ অবশ্য সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। ফলে আজকের ভারত যেন এক বিশাল প্রেসার কুকার। আগুন জ্বলছে। চাপ বাড়ছে। সিটি বাজছে। রাজপথে মিছিল হচ্ছে। কোথাও বিক্ষোভ, কোথাও পাল্টা বিক্ষোভ। কোথাও রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের আটক করা হচ্ছে, কোথাও তাদের সমর্থকরা স্লোগান দিচ্ছেন। আর রান্নাঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে রাজনীতিবিদরা বলছেন, ‘চিন্তা করবেন না। সব নিয়ন্ত্রণে আছে।’ কিন্তু প্রেসার কুকারেরও একটা সীমা আছে। একসময় ঢাকনা খুলবেই। তখন ভেতর থেকে বেরোবে না কোনো রাজনৈতিক স্লোগান, কোনো টেলিভিশন বিতর্ক, কোনো নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। বেরোবে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। আর সেই দীর্ঘশ্বাসের ভাষা খুব সহজ, ‘দেশটা কার, সেটা পরে ঠিক করবেন। আগে দেশটাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন!’ মোদির জন্যও তাই হয়তো আজকের সবচেয়ে জরুরি ‘মন কি বাত’ হতে পারে নিজের সঙ্গেই, ‘এতদিন দেশকে অনেক কথা বলেছি। এবার একটু দেশের কথা শুনি।’ কারণ ভারতকে জেতা যায় ভোটে। কিন্তু ভারতকে শান্ত রাখা যায় কেবল মানুষের মন জিতে।
আর মানুষের মন- সে বড় বিচিত্র জিনিস। ভোটের সময় হাততালি দেয়। স্লোগান দেয়। পোস্টার লাগায়। মিছিলে যায়। কখনো পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়ায়। কখনো নেতার সঙ্গে আটক হয়। তারপর এক দিন একা বুথে গিয়ে বোতাম টিপে বলে, ‘এই নিন, এবার আমার কথা শুনুন!’ সেই দিন কোনো টেলিভিশন অ্যাংকর চিৎকার করেন না। কোনো পুলিশ ব্যারিকেড দেয় না। কোনো নেতা মাইক হাতে দাঁড়ান না। শুধু একটি বোতামে চাপ পড়ে। আর সেই একটি মাত্র শব্দে কখনো কখনো বদলে যায় গোটা দেশের রাজনীতি।
তাই ‘মন কি বাত’ যতই চলুক, শেষ কথা কিন্তু বলে সেই নীরব মানুষটিই। তার আগে শুধু একটা অনুরোধ। মোদিজি, রাহুলজি, দিদিজি, নেতাজিরা- আপনারা মিছিল করুন, রাজনীতি করুন, ক্ষমতার লড়াই করুন। কিন্তু মাঝে মাঝে দেশের মানুষকেও একটু শান্তিতে থাকতে দিন। কারণ ভারত এখন হয়তো সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির অভাব বোধ করছে, সেটি কোনো নতুন স্লোগান নয়। সেটি হলো- ‘মনটা শান্ত।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন