কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও আগামী ২ অক্টোবর ‘সফট ওপেনিংয়ের’ তোড়জোড় চালাচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (বেবিচক)। অথচ এই তারিখে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
ঠিক দুই বছর আগে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বেশ তড়িঘড়ি করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ‘সফট ওপেনিং’ করেছিল বেবিচক। তখন বলা হয়েছিল, মাস ছয়ের মধ্যে এই টার্মিনাল থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। যদিও এখন পর্যন্ত ওই টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। ফ্লাইট পরিচালনারও কোনো খবর নেই।
ঠিক একইভাবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও ‘সফট ওপেনিং’ করতে যাচ্ছে বেবিচক। এজন্য তারা আগামী ২ অক্টোবর দিনক্ষণ ঠিক করেছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য দুটি এয়ারলাইনসকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। এ ছাড়া মর্যাদা পেতে বেবিচক আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থাকে (আইকাও) চিঠি দিলেও এখনো উত্তর দেয়নি তারা। উড়োজাহাজ সংস্থা আদৌ ফ্লাইট পরিচালনা করবে কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়।
জানা যায়, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের ১৫ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। যে দুটি এয়ারলাইনসকে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে, তারা সমীক্ষাও ঠিকমতো শুরু করতে পারেনি। এ অবস্থায় ২ অক্টোবর সফট ওপেনিং হলেও ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।
শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল ও কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রকল্পের কাজ শেষ করার আগেই কেন সফট ওপেনিং করা হলো, তা নিয়ে খোদ বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে। তাদের একটি পক্ষ জানায়, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের তিন মাস আগে তথা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ঘটা করে শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালের সফট ওপেনিং করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনায় সমীক্ষা চালাচ্ছে বিমান। এই সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কারণ, কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক রুটের মধ্যে কোনটির চাহিদা বেশি, তা বের করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এ বি এম রওশন কবীর।
বেবিচকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কক্সবাজার অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন মর্যাদা পাওয়ার পর বিমানবন্দরটির আনুষ্ঠানিক নাম হবে ‘কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ ৮৩ শতাংশ শেষ, আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে দেশের সব বিমানবন্দর রানওয়ের বাকি কাজ শেষ হলে সমুদ্র ছুঁয়ে নামবে প্লেন।
দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। এটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ২০২১ সালে কাজ শুরু করে বেবিচক। এই প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরটিতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে। আর বিদ্যমান ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট দৈর্ঘ্য থেকে বাড়িয়ে ৯ হাজার ফুটের নতুন রানওয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে।
বেবিচক সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২ অক্টোবর কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায় বেবিচক। এ জন্য আইকাওয়ের বিধিবিধান অনুযায়ী এয়ারএসি এআইপি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। ২ অক্টোবর উদ্বোধন করার প্রস্তুতি চলছে। পরে ৮ অক্টোবরের মধ্যে এই বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হতে পারে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী ইউনূস ভূঁইয়া জানান, ‘এখন পর্যন্ত বিমানবন্দরের ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’ বাকি কাজ এক মাসের মধ্যে শেষ এবং ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ইউনূস ভূঁইয়া বলেন, ‘সম্ভব না হলে তো উদ্বোধন বা ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হতো না।’
এদিকে কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনায় গত ১১ আগস্ট দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় বেসামরিক এয়ারলাইনস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক রূপান্তর সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ও বেবিচক সদস্য (এটিএম) গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. নুর-ই-আলম।
এয়ারলাইনসগুলো কক্সবাজার থেকে কোন ধরনের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে এবং কোন গন্তব্যে ফ্লাইট চালু করবে, তা লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি বিমান ও ইউএস-বাংলা। সংস্থা দুটি কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনায় আর্থিকভাবে কতটুকু লাভবান হবে, সে বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে।
আগামী ২ অক্টোবর উদ্বোধনের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আবার আইকাও সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে। সেটার জন্য আমরা আবেদন করেছি। সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে এয়ারপোর্টের সফট ওপেনিংটা হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন মো. নুর-ই-আলম।
দেশের বড় এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, ফ্লাইটে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারে চলাচলের দূরত্ব মাত্র ৪৫ মিনিটের। এ অবস্থায় কক্সবাজার নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক কোন রুটে কতসংখ্যক যাত্রী মিলবে, সে বিষয়টি মাথায় রেখে ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে কাজ করছে এয়ারলাইনসগুলো।
গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল ও রানওয়ের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। তখন তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এয়ারপোর্টটি প্রস্তুত হবে। এ জন্য সরকার এবং আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছি।’
১৫ শতাংশ কাজ বাকি রেখে কীভাবে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট শুরু হবে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, ‘হিসাব-নিকাশে যাচ্ছি না। তবে এটা বলতে পারি, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আংশিকভাবে ফ্লাইট চালু হতে পারে।’
বেবিচক সদস্য (এটিএম) নুর-ই-আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা ২ অক্টোবর কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করব- এটিই এখন আমাদের মূল কাজ। ১৫ শতাংশ কাজ বাকি রেখে কীভাবে কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন করা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন যে প্রকল্পের কাজ হচ্ছে, সেটি সম্প্রসারণ প্রকল্প। এখানে বিদ্যমান রানওয়ের মধ্যে বিমান ও ইউএস-বাংলার বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন এবং অবতরণ করছে। যেহেতু ৭৩৭ উড়োজাহাজগুলো ছয় ঘণ্টা উড্ডয়নে সক্ষম, তাই এই প্লেনগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও থাইল্যান্ডে যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।
এই বেবিচক কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন বিমানবন্দরের যে টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে একটি অংশ থেকেই আমরা আন্তর্জাতিক অ্যারাইভাল ও ডিপারচারের কাজ পরিচালনা করব। সেপ্টেম্বরের ২০ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে এর কাজ শেষ হয়ে যাবে। তারপর সফট ওপেনিং করব। প্রথমে ফ্লাইট কমই চলবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে মূল প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ফ্লাইটের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়বে।’
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন