প্রশাসন নিজের গা বাঁচানোয় এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই যে জায়গা থেকে গন্ধ ছড়াচ্ছে, তারা ঠিক সেই জায়গা মেরামতের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে তাদের মনোযোগ কম। সাদাপাথর ছাড়া প্রশাসনে বাকি সব কোয়ারি এখন উপেক্ষিত। শুধু সাদাপাথর নয়, সিলেটের সব পাথর কোয়ারি কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। তা না হলে পাথরখেকো চক্র আবারও পাথর লুটতরাজে পরিকল্পনা করবে।আমরা জানি, এরই মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাটে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা হয়েছে। তবে অতীতেও বন্ধ ঘোষণা হয়েছিল। তার মধ্যে এই চার উপজেলার নদী, পাহাড় ও কৃষিজমি বিনষ্ট করে ইচ্ছেমতো পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। সারা দেশে যখন সাদাপাথর নিয়ে তোলপাড় তখন তার পাশেই শাহ আরেফিন টিলার অবশিষ্ট অংশ লুট হয়েছে। রাংপানি নদীর পাথর লুট হয়েছে। অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে আজ সিলেটের বৈধ পর্যটন ব্যবসা হুমকির মুখে। পাথর লুণ্ঠনে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্টের তথ্যে সিলেট ভ্রমণে আগ্রহী পর্যটকদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
এ মুহূর্তে পাথর উত্তোলন বিষয়ে সৃষ্ট অনাচার বন্ধে প্রশাসনের নেওয়া কঠোরতা অব্যাহত রাখতে হবে। রাজনৈতিক নেতারদের প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে। দীর্ঘদিন এ সমস্যা কেবল প্রকৃতির অনিষ্টই করেছে। এখন প্রকৃতিকে এই ক্ষত সারানোর জন্য সময় দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পাথর উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
এই এলাকাগুলো পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে থাকুক। পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করে এ মহাপরিকল্পনা যেন আন্তর্জাতিক মানের হয় এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
শুধু পরিবেশ নয়, এর সামাজিক প্রভাবও মারাত্মক। ভূমি ধস, খননের ফলে দুর্ঘটনা, শ্রমিকদের অনিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। ধীরে ধীরে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনজীবনের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এসব কোয়ারি রক্ষা করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। রাষ্ট্র পরিবেশ রক্ষায় দায়বদ্ধ। প্রশাসনকে একটি স্পটে পড়ে থাকলে চলবে না। তাহলে বাকি জায়গা সেই সুযোগে দুর্বৃত্তরা সাবাড় করে নেবে। শারফিন টিলার ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, সব কোয়ারিতে সমান মনোযোগ দিয়ে অবৈধ উত্তোলন রোধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহল এ লুটপাটে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।
পরিবেশ বাঁচাতে হলে সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে অচিরেই সিলেটের এ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু সে উন্নয়ন যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেয়। প্রশাসনের এখনই উচিত কঠোর অবস্থান নেওয়া, যাতে প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত হয়।