বর্ষা মানেই নদী-নালা ও খাল-বিলে টলমল পানি। গ্রামীণ সড়ক ডুবে গেলে মানুষের যাতায়াত হয়ে পড়ে দুরূহ, আর তখনই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নে বর্ষার মৌসুমে যেন নৌকার মৌসুম শুরু হয়। ইউনিয়নের চারটি প্রধান ঘাটে প্রতিদিন শতাধিক নৌকার ভিড় হয়ে থাকে, আর সেই নৌকাতেই ভরসা করে হাজারো মানুষ।
প্রতিদিন ভোর ফোটার আগেই স্টেশন ঘাট, দহুকুলা ঘাট, ত্রিমোহনী এবং লাহিড়ীপাড়া স্কুল মাঠ ঘাটে মানুষের ভিড় জমে। শিক্ষার্থীরা হাতে বই-খাতা নিয়ে আসে, কৃষকরা বাজারের ঝাঁকা হাতে, আর অনেকেই মাছ বিক্রির তাড়া নিয়ে এগিয়ে আসেন। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মাঝির বাঁশির সুরে শুরু হয় পারাপার। নৌকায় ভরে ওঠে মানুষ ও মালপত্র, তারপরই নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলে। মোহনপুর ইউনিয়নের এই ঘাটগুলো থেকে প্রতিদিন যাত্রীরা পৌঁছে যান অন্তত ৫০-৬০টি গ্রাম ও বাজারে। এর মধ্যে রয়েছে কালিয়াকৈড়, পশ্চিম বংকিরাট, আঁচলগাতী, দত্তপাড়া, কাইমকোলা, হাটউধুনিয়া, ভাঙ্গুড়া বাজার, ফরিদপুর বাজারসহ অসংখ্য এলাকা।
তবে, যাতায়াতের এই একমাত্র ভরসা সঙ্গেই রয়েছে নানা দুর্ভোগ। ঘাটগুলোর কাছে যাত্রীদের জন্য কোনো ছাউনি বা বসার ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টির দিনে ভিজতে হয়, আর রোদে পুড়তে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নেই বিদ্যুতের আলো কিংবা কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কলেজছাত্রী মরিয়ম খাতুন বলেন, ‘বর্ষায় নৌকাই একমাত্র ভরসা। নৌকা ঘাটে প্রতিদিন প্রচণ্ড ভিড় থাকে, অনেক সময় দাঁড়িয়ে যেতে হয়। তবুও নৌকা ছাড়া উপায় নেই। নৌকা না পেলে স্কুল-কলেজে যেতে দেরি হয়, আর জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাফেরা করতে হয়।’
কৃষক ফিরোজ জানান, ‘ধান-সবজি বাজারে নিতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। কিন্তু যাত্রী ও মালপত্র বেশি হলে দুর্ঘটনার ভয় থাকে।’
পশ্চিম বংকিরাটের মাঝি আজিজুল বলেন, ‘ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকা চালাতে হয়। ঝড়, বৃষ্টি বা নদীর ঢেউ- কোনো কিছু তোয়াক্কা না করেই নৌকার চাকায় সংসার চলে। মানুষদের পারাপার না করতে পারলে আমাদের ভাত জুটবে না।’
স্থানীয়রা মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে যদি নৌকা ঘাটগুলো সংস্কার করা হয়, যাত্রীদের জন্য ছাউনি, বসার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও আলোর ব্যবস্থা করা হয়, তবে মানুষের দুর্ভোগ অনেকটা কমবে। দিনের শেষে, সন্ধ্যা নামতেই আবারও নদীর বুক চিরে ছুটে চলে নৌকা। তাই এখানে নৌকা শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের অংশ।