× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০৩:১৪ এএম

বৈশ্বিক অর্থনীতি এক অনিশ্চয়তার মোড়ে

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০৩:১৪ এএম

বৈশ্বিক অর্থনীতি এক অনিশ্চয়তার মোড়ে

বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক জটিল ও অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রেকর্ড পরিমাণ বৈশ্বিক ঋণ, অন্যদিকে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয়Ñ সব মিলিয়ে গোটা বিশ্ব যেন নতুন এক অর্থনৈতিক ঝুঁঁকির মুখে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো একের পর এক সতর্কবার্তা দিচ্ছে, আগামী কয়েক বছর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অর্থায়ন ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে। মাত্র তিন মাসে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ। করোনা মহামারির পর এত দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির ঘটনা আর দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঋণের বড় অংশের জন্য দায়ী বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতিÑ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং চীনে বেসরকারি খাতের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

ঋণের বোঝা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ : বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির মোট উৎপাদনের তুলনায় বৈশ্বিক ঋণের অনুপাত ৩০৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্ব যত আয় করছে, তার তিন গুণেরও বেশি ঋণের বোঝা বহন করছে। বিশেষ করে নরওয়ে, কুয়েত, চীন, বাহরাইন ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে ঋণের হার এক বছরে ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বড় ঋণসংকট তৈরি করতে পারে। অনেক দেশ এখন উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ব্যয়ে বেশি অর্থ খরচ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়; কিন্তু ঋণের সুদ ও দায় বাড়তেই থাকে। বর্তমানে ঠিক সেই পরিস্থিতির দিকেই এগোচ্ছে বিশ্ব।

যুদ্ধ ও তেলের দামে নতুন সংকট : বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলে। ইতিমধ্যে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়তে পারে। তাদের আশঙ্কা, আগামী বছরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত এক ধরনের ‘সরবরাহ ধাক্কা’। অর্থাৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, জ্বালানি ব্যয় বাড়ছেÑ ফলে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ছে।

মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া : করোনা মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের ধাক্কা এখনো কাটেনি। তার ওপর নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ও জিম্বাবুয়েতে মূল্যস্ফীতি কয়েকশ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলোতেও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং সামাজিক অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। কিন্তু সুদের হার বাড়ালে ঋণের খরচও বাড়ে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমে যায়। এতে আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

ইরানে ভয়াবহ খাদ্যসংকট : যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ইরানে। দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কিছু খাদ্যপণ্যের দাম তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। কঠিন ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ, তরল তেলের দাম ৩০৮ শতাংশ এবং চালের দাম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মানও ভয়াবহভাবে পড়ে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়েছে। ইরান সরকার ভর্তুকি ও কুপনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যুদ্ধ, অবরোধ ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ দেশের নতুন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে উদ্বেগ : শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ নাগরিক এখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁঁকি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের মজুতও এখন আট বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শুধু দাম বৃদ্ধি নয়, সরাসরি জ্বালানি সংকটও দেখা দিতে পারে।

ভারতে অর্থনৈতিক চাপ : মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে ভারতেও। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবাজারে বড় ধস নেমেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনগণকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বাসা থেকে কাজ করা, গণপরিবহন ব্যবহার, বিদেশ ভ্রমণ কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ। কারণ তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্য থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।

অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ : বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে যুদ্ধ, ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে আঘাত হানছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বরং আগামী কয়েক বছর বিশ্বকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি এবং ঋণের বাড়তি চাপ নিয়ে চলতে হতে পারে। আর এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত হানবে সাধারণ মানুষের জীবনেÑ যাদের আয় সীমিত, কিন্তু ব্যয় প্রতিদিন বাড়ছে। বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑ এই দীর্ঘ অস্থিরতার পথ থেকে বের হওয়ার উপায় কী? উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!