যুদ্ধ যেন এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং মানবসভ্যতার নিত্যসঙ্গী বাস্তবতা। এক সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেক সংঘাতের সূচনা হচ্ছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে গোলার শব্দ থামার আগেই অন্য প্রান্তে আকাশ ঢেকে যাচ্ছে যুদ্ধবিমানের গর্জনে। ফলে বিশ^বাসী ক্রমশ এমন এক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছে, যেখানে শান্তি যেন ব্যতিক্রম, আর সংঘাতই হয়ে উঠছে স্বাভাবিক বাস্তবতা।
নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ২০২৫ সাল ছিল সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ বছর। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভিন্ন সশস্ত্র সংঘর্ষে এক বছরে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় দুই লাখ ৪৫ হাজার মানুষ। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবন, একটি স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর অন্তত ৬৫টি রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এসব সংঘাতে অন্তত একটি রাষ্ট্র সরাসরি জড়িত ছিল। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে আটটিতে পৌঁছেছে, যা গত আট দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই সংঘাতগুলোর তালিকায় রয়েছে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান, ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা, আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘর্ষ, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধ এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা। বিশে^র ৩৫টিরও বেশি দেশ কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধ বা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। অনেক রাষ্ট্র আবার একাধিক সংঘাতময় অঙ্গনে একযোগে সক্রিয় রয়েছে।
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ভয়াবহ বৃদ্ধি। গত বছর সরাসরি সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৬ হাজার ৫০০ জন। অথচ আগের বছর এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার দুইশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নিরীহ মানুষের মৃত্যু কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
এই বিপুল প্রাণহানির অন্যতম কেন্দ্র ছিল সুদান। দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতে বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে অবরোধ ও গণহত্যায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে লাখো মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লেও সবচেয়ে বেশি সংঘাত নথিভুক্ত হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশে। সেখানে ২৯টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এরপর রয়েছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা ও ইউরোপ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে একের পর এক বড় সংঘাত শুরু হয়েছে। বিশ^বাসী কার্যত এক মুহূর্তের জন্যও শান্তির স্বস্তি পায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও উত্তেজনা প্রশমনের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং যুদ্ধবিরতির আলোচনার আড়ালে চলছে নতুন সামরিক প্রস্তুতি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থার অন্যতম কারণ চীন। ইরানকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে বেইজিং। তাদের দৃষ্টিতে ইরান কেবল জ্বালানি সরবরাহকারী রাষ্ট্র নয়; বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। তাই তেহরানের সামরিক ও কৌশলগত শক্তি দুর্বল করার লক্ষ্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গাজা, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই জলপথে যেকোনো অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংঘাত মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই অস্থিরতার মাঝেই যুদ্ধের আরেকটি মুখ উন্মোচিত হয়েছেÑ অস্ত্র বাণিজ্যের প্রসার। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমরাস্ত্র শিল্পের মুনাফাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালে প্রায় ছয়শ ৭৮ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ রাজস্ব অর্জন করেছে।
গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা এবং নতুন নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ অস্ত্রের চাহিদা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধ যেমন ধ্বংস ডেকে আনে, তেমনি কিছু শিল্পখাতের জন্য তা বিপুল মুনাফার উৎস হয়ে ওঠেÑ এই নির্মম বাস্তবতাও নতুন করে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সমাজের বিভিন্ন স্তরে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। সাধারণ মানুষের জন্য বিমানভাড়া, জ্বালানির মূল্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও বিশ্বের ধনী শ্রেণির জীবনযাত্রায় তার ছাপ তুলনামূলকভাবে কম। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। নিরাপত্তা, সময় নিয়ন্ত্রণ এবং অনিশ্চয়তা এড়াতে বিত্তশালীরা ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। অর্থনীতিবিদেরা একে বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। একদিকে মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত মানুষের ব্যয়ভার অসহনীয় হয়ে উঠছে, অন্যদিকে ধনীরা আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ভোগের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্ব কি তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের সরল উত্তর এখনো কেউ দিতে পারছেন না। বর্তমান সংঘাতগুলোর অধিকাংশই আঞ্চলিক; তবে সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বড় শক্তিগুলো। এক রাষ্ট্রের মিত্র অন্য রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমশ মেরুকৃত হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি বৈশ্বিক যুদ্ধের সম্ভাবনা এখনো অনিবার্য নয়। কিন্তু ভুল হিসাব, সীমান্ত উত্তেজনার আকস্মিক বিস্তার কিংবা কূটনৈতিক ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ রূপ দিতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সংকট নিরসনের কার্যকর পথও সংকুচিত হচ্ছে।
মানবসভ্যতা ইতিহাসের বহু অন্ধকার সময় অতিক্রম করেছে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষ শান্তির প্রতিষ্ঠান গড়েছিল, আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করেছিল এবং সহযোগিতার নতুন কাঠামো নির্মাণ করেছিল। কিন্তু আজ সেই ব্যবস্থাগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।
যুদ্ধের প্রতিটি বিস্ফোরণ শুধু একটি ভূখ-কে নয়, সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রতিটি নিহত শিশু, উদ্বাস্তু পরিবার কিংবা বিধ্বস্ত নগরী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ শান্তি কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; বরং প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয় এমন এক মূল্যবান দায়িত্ব।
আজকের পৃথিবী তাই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ খোলাÑ একটি আরও গভীর মেরুকরণ, প্রতিশোধ ও সংঘাতের; অন্যটি সংলাপ, সহযোগিতা ও মানবিক বোধের। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের পৃথিবী যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে জেগে উঠবে, নাকি শান্তির নতুন ভোর দেখবে।

