বিশ্ব একসময় ভেবেছিল, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ধীরে ধীরে কমে আসবে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়। হাজার হাজার বিধ্বংসী অস্ত্র ভেঙে ফেলা হবে, শক্তিধর দেশগুলো নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটবে, আর মানবসভ্যতা পরমাণু আতঙ্কের অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সেই আশা আজ ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বরং নতুন বাস্তবতা হলোÑ পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এখন আগের চেয়ে আরও বেশি আগ্রহী তাদের অস্ত্রভা-ার আধুনিকায়নে। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত ওয়ারহেড, সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সামরিক প্রযুক্তি এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সক্ষমতা নিয়ে শুরু হয়েছে এক নতুন প্রতিযোগিতা। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।
কমছে মোট সংখ্যা, বাড়ছে ব্যবহারের প্রস্তুতি : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের হাতে মোট পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১৮৭টি। সংখ্যাটি কয়েক দশক আগের তুলনায় কম হলেও উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। এসব অস্ত্রের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি এখন ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে।
দুই পরাশক্তির দখলে বিশ্বের অধিকাংশ অস্ত্র : বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রভা-ারের প্রায় ৮৩ শতাংশই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। রাশিয়ার হাতে পাঁচ হাজারের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও পাঁচ হাজারের কাছাকাছি ওয়ারহেড রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও দুই দেশই আগের তুলনায় অস্ত্র ধ্বংস করেছে, তবু তারা বিশাল আকারের আধুনিকায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
দ্রুত এগোচ্ছে চীন : পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে চীন। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির হাতে বর্তমানে ছয় শতাধিক ওয়ারহেড রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবছর প্রায় একশ করে নতুন ওয়ারহেড যুক্ত হয়েছে তাদের ভা-ারে।
ভারত-পাকিস্তান : উপমহাদেশে বাড়ছে উদ্বেগ
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানও পিছিয়ে নেই। প্রতিবেদন বলছে, ভারতের হাতে বর্তমানে প্রায় ১৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দেশটি প্রথমবারের মতো ১২টি ওয়ারহেডকে সরাসরি মোতায়েনকৃত হিসেবে বিবেচনা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নীতি ছিল ওয়ারহেড ও ক্ষেপণাস্ত্র আলাদা করে সংরক্ষণ করা। কিন্তু নতুন বাস্তবতায় দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী অস্ত্র প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের হাতে রয়েছে প্রায় ১৭০টি ওয়ারহেড।
উত্তর কোরিয়ার অপ্রতিরোধ্য উচ্চাকাক্সক্ষা : বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি উত্তর কোরিয়া প্রকাশ্যেই জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক কর্মসূচির সম্প্রসারণ থামাবে না।
ইসরায়েলের নীরব কৌশল : ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেনি। তবুও আন্তর্জাতিক গবেষকদের ধারণা, দেশটির কাছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ওয়ারহেড রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় বিভিন্ন কর্মকা- নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের এই সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
ইরানকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা : যদিও ইরান নিজেকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তবু তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। দেশটি উপকূলীয় পাঁচটি স্থানে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। তেহরানের দাবি, এগুলো সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে।
অর্থের পাহাড় গিলছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা : পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপে কাজ করা আন্তর্জাতিক জোটের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে চীন, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া। গবেষকদের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে এই ৯টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় করেছে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার। সমালোচকেরা বলছেন, যখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবা ঘাটতি এবং মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তখন এই বিপুল অর্থ ব্যয় মানবিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যোগ করছে নতুন ভয় : বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তনির্ভর সামরিক ব্যবস্থা ভবিষ্যতের পারমাণবিক যুদ্ধকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
অনিশ্চয়তার পৃথিবী : স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্ব অন্তত জানত, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে ভারসাম্যের নিয়ম কী। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। এখন একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে দ্রুত উত্থানশীল চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান, পূর্ব এশিয়ায় উত্তর কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। গবেষকদের ভাষায়, পৃথিবী হয়তো আবারও এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা নয়, বরং সেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা, প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক ভাষ্যের আগ্রাসন মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। নিরস্ত্রীকরণের স্বপ্ন এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি। কিন্তু বিশ্বনেতারা যদি কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগে এগিয়ে না আসেন, তাহলে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি কিংবা আঞ্চলিক সংঘাতও একদিন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনা করতে পারে। পরমাণুর ছায়ায় দাঁড়িয়ে আজকের পৃথিবী তাই এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখিÑ নিরাপত্তার নামে আরও অস্ত্র, নাকি অস্ত্রের ভয় থেকে মুক্ত এক ভবিষ্যৎ? সেই উত্তর খুঁজে পাওয়াই এখন মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন