দীর্ঘ সংঘাত, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার পর অবশেষে একটি সমঝোতার পথে এগোচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারককে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে এটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই সমঝোতাকে কেন্দ্র করে যতটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে, ততটাই প্রশ্নও উঠছে। এটি কি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ খুলে দেবে, নাকি ইতিহাসের আরেকটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হিসেবেই থেকে যাবে?
‘বিজয়’ হিসেবে চুক্তি তুলে ধরছে তেহরান : ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমঝোতাটিকে সরাসরি ছাড় বা পিছু হটা হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করছে। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ একে ‘চূড়ান্ত বিজয়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে তা ইরানের অর্থনীতি ও সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কট্টরপন্থিদের আপত্তি : ইরানের কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশ চুক্তির বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আলোচনার আড়ালে ওয়াশিংটন নিজেদের কৌশলগত স্বার্থই অনুসরণ করে। কিছু সংসদ সদস্য এমনকি খসড়া সমঝোতাকে ‘বিদেশি প্রভাবের দলিল’ বলেও সমালোচনা করেছেন।
অর্থনীতির চাপে আলোচনার পথে ইরান : রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং শিল্পক্ষেত্রের ক্ষতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কর্মসংস্থান কমেছে এবং জাতীয় মুদ্রার মূল্য আরও দুর্বল হয়েছে।
১৪ দফা সমঝোতায় কী আছে? প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধবিরতি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল বিষয়গুলো হলোÑ যুদ্ধ ও শত্রুতা বন্ধ, দুই দেশ এবং তাদের মিত্ররা সামরিক সংঘাত বন্ধ করবে এবং ভবিষ্যতে পরস্পরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকবে। সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা : ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চালানো হবে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় শুরু হবে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি : চূড়ান্ত চুক্তি হলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির ঘোষণা : ইরান পুনরায় জানিয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও তদারকির বিষয়গুলো পরে নির্ধারণ করা হবে।
৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা : সমঝোতার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল। এই অর্থ সরাসরি সরকারি অনুদান হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প, অবকাঠামো এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নে এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্গঠনে এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই তহবিল কার্যকর হবে শুধু তখনই, যখন দুই দেশ চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে।
কেউ কি সত্যিই জিতেছে? যুদ্ধ শেষের দিকে এগোলেও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছেÑ এই সংঘাতে আসলে কে জিতেছে? একটি শক্তিশালী মতামত হলো, বাস্তবে কেউই জেতেনি। ইরান সরকার পতন এড়াতে সক্ষম হলেও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির শিল্প, মুদ্রা ও অবকাঠামো বড় আঘাত পেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন : যদিও প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে, তবুও সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত। এর মধ্যে রয়েছেÑ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও যাচাইব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্ন, লেবানন ও অন্যান্য মিত্রগোষ্ঠী সম্পর্কিত ইস্যু, এসব বিষয়ে সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে : বর্তমান সমঝোতা নিঃসন্দেহে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের জন্য একটি স্বস্তির বার্তা। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং নতুন সংঘাতের আশঙ্কা সাময়িকভাবে কমিয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ ইতিহাস বলে, যুদ্ধবিরতি আর স্থায়ী শান্তি এক জিনিস নয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা অবিশ্বাস, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে আগামী ৬০ দিনের আলোচনা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই সমঝোতা কি সত্যিই নতুন এক শান্তিপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করবে, নাকি কেবল পরবর্তী সংকটের আগে সাময়িক বিরতি হয়ে থাকবেÑ তার উত্তর সময়ই দেবে।

