মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অবরোধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল আলোচিত সমঝোতা হয়েছে। যুদ্ধের ১০৬ দিনের মাথায় হওয়া এই সমঝোতাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরছে। ইরান বলছে তারা কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দাবি করছে তাদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। কিন্তু চুক্তির প্রকৃত বিষয়বস্তু এখনো পুরোপুরি প্রকাশ না হওয়ায় বিশ^জুড়ে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছেÑ আসলে জিতল কে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, কূটনীতির ময়দানে ইরান বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। আবার সামরিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি হলেও বিজয়-পরাজয়ের হিসাব এখনো অস্পষ্ট।
ইরানের দাবিÑ প্রতিরোধের ফল কূটনৈতিক বিজয় : যুদ্ধের শুরুতে ব্যাপক হামলার মুখে পড়ে ইরান। সামরিক স্থাপনা, অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর একের পর এক আঘাত আসে। তবু ইরানের নেতৃত্ব দাবি করছে, তারা মাথা নত করেনি। ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানি জনগণের দৃঢ়তা এবং প্রতিরোধের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আসতে হয়েছে। তার ভাষায়, ইরান বিদেশি চাপের সামনে নতি স্বীকার না করে কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে।
তেহরানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অর্জন হলোÑ যুদ্ধ ও অবরোধের মধ্যেও রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে গেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানকে নতুন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে পশ্চিমা শক্তিগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবÑ যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতাই লাভজনক : যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচনের আগে যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। এতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের বদলে সমঝোতার পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প এখন বলছেন, ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা বিশে^ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও অনেক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলÑ সাফল্য নাকি কৌশলগত বিপর্যয়? : যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ ছিল ইসরায়েল। দেশটির ভেতরেও এই সমঝোতা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, ইরানকে সম্পূর্ণ দুর্বল করতে না পারা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ব্যর্থতা।
লেবাননÑ শান্তির আশা, অনিশ্চয়তার ভয় : যুদ্ধের আরেক বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশ লেবানন। কয়েক মাসের সংঘাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। তাই যুদ্ধবিরতি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা এত সহজ নয়। অনেক লেবাননি আশঙ্কা করছেন, এই সমঝোতার ফলে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং হিজবুল্লাহ নতুন করে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের পর অর্থনীতিতে ইরানের বড় সুযোগ : যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান অর্থনৈতিকভাবে বড় সুবিধা পাওয়ার পথে রয়েছে। সমঝোতা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বড় অংশ তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ইরান আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশটি প্রতিদিন প্রায় বিশ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হবে। এর পাশাপাশি বিশে^র বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ ইরানি সম্পদ ধীরে ধীরে অবমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব অর্থের পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের কাছে বিজয়ের সংজ্ঞা ভিন্ন : রাজনীতিবিদরা বিজয়ের দাবি করতে পারেন, সেনাবাহিনী নিজেদের সাফল্যের গল্প বলতে পারে, কূটনীতিকরা অর্জনের হিসাব তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। ইরানে যুদ্ধ, অবরোধ এবং মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। কর্মসংস্থান কমেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তাই সাধারণ ইরানিদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোÑ এই সমঝোতা কি তাদের জীবন সহজ করবে? যদি খাদ্যপণ্যের দাম কমে, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা দূর হয়, তা হলে সেটিই হবে তাদের কাছে প্রকৃত বিজয়।
শান্তিই কি একমাত্র বিজয়ী? : যুদ্ধের শেষে প্রায় সব পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। ইরান বলছে তারা প্রতিরোধে সফল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করেছে। ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলছে। লেবানন শান্তির আশায় বুক বাঁধছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের কারণে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বহু শহর ধ্বংস হয়েছে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সেই কারণে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে কেউ জেতেনি। যদি কোনো বিজয়ী থেকে থাকে, তবে সেটি হলো যুদ্ধবিরতি, আলোচনার পথ এবং শান্তির সম্ভাবনা।
তবু একটি প্রশ্ন রয়ে যায়Ñ এই শান্তি কি স্থায়ী হবে, নাকি এটি কেবল পরবর্তী সংঘাতের আগের সাময়িক বিরতি? মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎই তার উত্তর দেবে।

