ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

এক দেশে জন্ম, অন্য দেশের জার্সি

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬, ০২:২৯ এএম

আধুনিক ফুটবল শুধু মাঠের লড়াই নয়; এটি আসলে সমকালীন ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক অভিবাসন এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন। ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকালে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আজকের ফুটবলারদের পরিচয়পত্র কোনো একক ভৌগোলিক সীমারেখায় বন্দি নেই। ইউরোপের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা, সেখানকার বিশ্বমানের একাডেমিতে ফুটবলের হাতেখড়ি হওয়া অনেক তরুণ আজ বুক চেতিয়ে লড়ছেন তাদের বাবা-মায়ের আদি ভিটে অর্থাৎ আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর হয়ে। আবার উল্টো চিত্রও সমান সত্য। বহু সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের আইনি নমনীয়তা ফুটবলের প্রথাগত শক্তির ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিচ্ছে, যা একই সঙ্গে একটি সমাজতাত্ত্বিক এবং ক্রীড়া-কৌশলগত গবেষণার বিষয়।

আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতা

অতীতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিয়ম ছিল অত্যন্ত কঠোর। একবার কোনো দেশের অনূর্ধ্ব বা মূল দলে খেললে অন্য দেশের জার্সি গায়ে জড়ানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ফিফা তাদের প্লেয়ার এলিজিবিলিটি নিয়মে নমনীয়তা আনার পর ফুটবলারদের সামনে তৈরি হয়েছে আত্মপরিচয় বেছে নেওয়ার স্বাধীন আকাশ। একজন খেলোয়াড় যখন ফ্রান্স, স্পেন বা বেলজিয়ামের মতো ইমিগ্র্যান্ট-প্রধান দেশে জন্মান, তখন তার মনস্তত্ত্বে দুটি সত্তা সমান্তরালে বাস করে। অনেক সময় দেখা যায়, ইউরোপের পরাশক্তি দেশগুলোর মূল দলে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় সাইডবেঞ্চে হারিয়ে যান। ঠিক এই জায়গাতেই মরক্কো, আলজেরিয়া, ঘানা বা ক্যামেরুনের মতো দেশগুলো তাদের ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়ে আনার মিশন শুরু করে। খেলোয়াড়দের জন্যও এটি একটি দারুণ সুযোগ। ইউরোপের সেরা একাডেমিতে শেখা ফুটবলীয় প্রজ্ঞা দিয়ে নিজের আদি দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে নায়ক হওয়ার এই রোমাঞ্চ অনেক তরুণকে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

সমাজতাত্ত্বিক ক্যানভাস

এই গ্লোবাল ইমিগ্রেশনের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ সমাজতাত্ত্বিক ও ঔপনিবেশিক ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপের দেশগুলোতে (বিশেষ করে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য) পাড়ি জমিয়েছিলেন। আজকের প্রজন্মের ফুটবলাররা মূলত সেই প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের সন্তান।

ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে এই অভিবাসী প্রতিভাদের ব্যবহার করে নিজেদের ফুটবল সাম্রাজ্য সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৯৮ বা ২০১৮ সালের বিশ্বজয়ী ফরাসি দলের দিকে তাকালে দেখা যায়, আফ্রিকার রক্ত না থাকলে ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাস এতটা সমৃদ্ধ হতো না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটটি চমৎকার বিপরীতমুখী ঋণ শোধের গল্প। এখন অভিবাসীদের সন্তানরা ইউরোপের করদাতার টাকায় বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ নিয়ে, সেই শিক্ষাকে বিলিয়ে দিচ্ছেন তাদের পূর্বপুরুষের দেশে। এটি কেবল ফুটবলীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক পুনরুত্থান এবং নিজের শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার বহির্প্রকাশ।

মরক্কো মডেল

গ্লোবাল ইমিগ্রেশন কীভাবে একটি অনুজ্জ্বল দলকে রাতারাতি বিশ্বমঞ্চের ডার্ক হর্স বানিয়ে দিতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মরক্কো। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে তাদের সেমিফাইনালে ওঠার রূপকথাটি কিন্তু হুট করে তৈরি হয়নি। সেই স্কোয়াডের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৪ জনই জন্মেছিলেন মরক্কোর বাইরে ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও কানাডায়। আশরাফ হাকিমি (স্পেনে জন্ম) কিংবা হাকিম জিয়েশ (নেদারল্যান্ডসে জন্ম) এরা সবাই ইউরোপীয় ফুটবলের খাঁটি উৎপাদন, কিন্তু মাঠে তারা জান লড়িয়েছেন মরক্কোর লাল-সবুজ জার্সির জন্য।

ভারসাম্য বদলের চক্র

এই গ্লোবাল ডায়াসপোরা ব্যবহারের ফলে আফ্রিকার ফুটবল এখন আর কেবল শারীরিক শক্তি বা গতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ইউরোপীয় লিগে খেলা ছেলেরা দলের ভেতর নিয়ে আসছেন নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন, জোন ডিফেন্সের পরিপক্বতা এবং স্নায়ুচাপ ধরে রাখার পেশাদার মানসিকতা। ফলে গ্রুপ পর্বের গাণিতিক সমীকরণে ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার তথাকথিত বড় দলগুলো এখন আর আফ্রিকান দলগুলোকে অনায়াসে হারিয়ে দেওয়ার হিসাব কষতে পারে না।

সংস্কৃতির মেলবন্ধন

২০২৬ সালের ৪৮ দলের বিশাল বিশ্বকাপে এই প্রবণতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাঠের বাইরে যে অভিবাসন নিয়ে ইউরোপ বা আমেরিকার রাজনীতি উত্তাল থাকে, মাঠের ভেতরে সেই অভিবাসনই ফুটবলকে দিচ্ছে অনন্য নান্দনিকতা। এক দেশের একাডেমি, অন্য দেশের আবেগ; এই দুইয়ের মিলনে ফুটবল আজ তার আসল বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে।

খেলোয়াড়দের এই মাল্টিপল ন্যাশনালিটি বা বহু-নাগরিকত্বের চয়েস প্রথাগত ফুটবলীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, একজন মানুষ একই সঙ্গে ইউরোপের নাগরিক হতে পারেন, আবার তার হৃদয়ের স্পন্দনজুড়ে থাকতে পারে আফ্রিকার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের ধুলাবালি। শেষ পর্যন্ত, গ্লোবাল ইমিগ্রেশনের এই জোয়ার ফুটবল মানচিত্রের সেই পুরোনো উপনিবেশবাদী ঔদ্ধত্যকে গুঁড়িয়ে দিয়ে এক নতুন, সাম্যবাদী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বমঞ্চ তৈরি করছে, যেখানে ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখার অধিকার এখন সবার সমান।