ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

মুখোমুখি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান

করাচির হামলার বদলা! 

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

করাচিতে আধাসামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরে প্রাণঘাতী হামলার মাত্র একদিনের মধ্যেই আফগানিস্তান সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে পাকিস্তান। স্থল ও আকাশপথে পরিচালিত এই অভিযানে পাকিস্তানের দাবি, অন্তত ২৯ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার বলছে, নিহতদের বেশির ভাগই সাধারণ বেসামরিক মানুষ। নারী ও শিশুসহ বহু মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ তুলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও এনেছে কাবুল। এই হামলার পর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক মাস আগে সীমান্ত সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সাম্প্রতিক এই অভিযান সেই সমঝোতাকে কার্যত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সীমান্তজুড়ে আরও বড় সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, প্রথমে খাইবার পাখতুনখোয়ার বাজাউর এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্থল অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের এক শীর্ষ কমান্ডারসহ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

এরপর রাতের অন্ধকারে আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান। পাকিস্তানের দাবি, এসব এলাকায় জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবির, অস্ত্রাগার ও নিরাপদ ঘাঁটি ছিল। হামলায় আরও ২৫ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

ইসলামাবাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। বিশেষ করে করাচিতে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে আত্মঘাতী হামলায় তিন থেকে চারজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, করাচির হামলার সঙ্গে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের সহযোগী সংগঠন জামাত-উল-আহরারের সদস্যরা জড়িত ছিল। ইসলামাবাদের দাবি, এই সংগঠনের সদস্যরা আফগান ভূখ-ে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করে থাকে। তাই সীমান্তের ওপারে থাকা তাদের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

তবে পাকিস্তানের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। কাবুলের অভিযোগ, পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি, গ্রাম এবং মসজিদে হামলা চালিয়েছে। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ পাকিস্তানের এই সামরিক অভিযানকে ‘কাপুরুষোচিত আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, নিরীহ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর হামলা চালিয়ে কোনোভাবেই সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। তিনি এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।

আফগান কর্মকর্তাদের দাবি, বিমান হামলার সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে পাকতিয়া প্রদেশের সামকানি এলাকায়। সেখানে একটি আবাসিক এলাকায় প্রথম দফায় বোমা হামলার পর স্থানীয় মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে কিছু সময় পর একই স্থানে দ্বিতীয় দফায় আবারও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় হামলায় উদ্ধারকর্মী, গ্রামবাসী এবং আহতদের সাহায্যে ছুটে আসা অনেক মানুষ নিহত হন। এই ধরনের কৌশলকে আন্তর্জাতিক সামরিক পরিভাষায় ‘দ্বৈত আঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আপত্তি রয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন আহত ব্যক্তি জানিয়েছেন, হামলার সময় এলাকায় কোনো জঙ্গির উপস্থিতি ছিল না। তাদের দাবি, পুরো হামলার শিকার হয়েছেন সাধারণ গ্রামবাসীরাই। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া অনেক নারী ও শিশুর করুণ চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান তাদের অবস্থানে অনড়। দেশটির সরকার বলছে, অভিযান ছিল অত্যন্ত নির্ভুল এবং শুধু সন্ত্রাসী ঘাঁটিকেই লক্ষ্য করা হয়েছে। কোনো সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। পরে কয়েক দফা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সীমান্তে ছোটখাটো গোলাগুলি এবং পাল্টাপাল্টি অভিযানের ঘটনা থেমে থাকেনি। সর্বশেষ এই বিমান হামলার ফলে সেই উত্তেজনা আবারও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

করাচির হামলার পর পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং সমুদ্রবন্দরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তজুড়ে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই হামলার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। কাবুলের বক্তব্য, যদি সত্যিই জঙ্গিদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়ে থাকে, তবে এত বিপুলসংখ্যক নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের হতাহতের ব্যাখ্যা পাকিস্তানকে দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান একদিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেখাতে চাইছে। কিন্তু এই কৌশল যদি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

চীন, কাতার, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ অতীতেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক এই হামলার পর আবারও কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সীমান্তের দুই পাশেই এখন চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। পাকিস্তান তাদের অভিযান অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে, অন্যদিকে আফগানিস্তানও এই হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত আবারও বড় ধরনের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।