রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একযোগে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের বিভিন্ন সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধারে এখনো অভিযান চলছে। একই সময়ে রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে অন্তত একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জেলেনস্কির সতর্কবার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হামলা : হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্ভাব্য বৃহৎ রুশ হামলার বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন। প্রশাসনের নির্দেশে বহু মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভূগর্ভস্থ মেট্রোস্টেশন ও নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। ফলে সম্ভাব্য প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে বলে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
রাত গভীর হতেই কিয়েভজুড়ে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ব্যালিস্টিক ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি অসংখ্য ড্রোন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে। একাধিক আবাসিক ভবন, চিকিৎসা-সংক্রান্ত স্থাপনা এবং বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ : কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেঙ্কো জানান, রাজধানীর প্রায় তিন ডজন স্থানে হামলার চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটি বহুতল আবাসিক ভবনের কয়েকটি তলা ধসে পড়েছে। বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো হামলাকে রাজধানীর ওপর চালানো সবচেয়ে বিস্তৃত হামলাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, একযোগে বহু এলাকায় আঘাত হানার কারণে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। নিহতদের স্মরণে রাজধানীতে শোক পালনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি : ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, এক রাতেই রাশিয়া ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৯৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হলেও কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং একাধিক ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। হামলার ফলে কিয়েভ ছাড়াও ইউক্রেনের আরও কয়েকটি অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলার সময় রাজধানীর বাসিন্দারা শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটান। বহু পরিবার আতঙ্কে পুরো রাত ঘুমাতে পারেনি।
রাশিয়ার দাবি, সামরিক স্থাপনাই ছিল লক্ষ্য : রাশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেনের সামরিক কারখানা ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই রাশিয়া এই অভিযান পরিচালনা করেছে এবং নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবেই আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে পাল্টা হামলা : রুশ হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেন পাল্টা আঘাত হানে রাশিয়ার নিজনি নভগোরোদ অঞ্চলের কস্তোভো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে। ইউক্রেনের দাবি, শোধনাগারের একটি প্রধান উৎপাদন ইউনিটে আঘাত করা হয়েছে। রাশিয়ার স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ওই হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন। তবে শোধনাগারের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলার প্রভাব : গত কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সরবরাহকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ হয়েও রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির বহু এলাকায় পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। গণপরিবহন, কৃষিকাজ এবং বিভিন্ন জরুরি পরিষেবাও এই সংকটের প্রভাব অনুভব করছে। কিছু অঞ্চলে বাস চলাচল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দৈনন্দিন পরিষেবায় বিঘœ ঘটছে।
কৃষি খাতে বাড়ছে উদ্বেগ : গ্রীষ্মকাল রাশিয়ার শস্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় কৃষকেরা সময়মতো ফসল কাটতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষিযন্ত্র পরিচালনা থেকে শুরু করে শস্য পরিবহনÑ সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ঘাটতি সমস্যা তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনেও এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
ভারত ও প্রতিবেশী দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি : অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া সমুদ্রপথে ভারত থেকে পেট্রোল আমদানি শুরু করেছে বলে শিল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেলারুশ ও কাজাখস্তান থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি জাহাজে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল ইতোমধ্যে রাশিয়ার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনও সাম্প্রতিক এক বৈঠকে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে কৃষি ও জরুরি পরিষেবায় সরবরাহ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
যুদ্ধে নতুন মাত্রা : এদিকে রাশিয়ার সামরিক বিশ্লেষকেরা দাবি করেছেন, জুন মাসে ইউক্রেনের প্রায় ৩৮ হাজার সেনা নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন। যদিও এই দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। অপরদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে এখন আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্র নয়, জ্বালানি, অর্থনীতি, খাদ্য উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিয়েভে সর্বশেষ ভয়াবহ হামলা এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টা আঘাত প্রমাণ করছে, দুই পক্ষই এখন প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করার কৌশল অনুসরণ করছে। ফলে সংঘাতের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

