তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। সম্মেলনে একদিকে যেমন শত শত কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ ও অস্ত্র সংগ্রহের ঘোষণা এসেছে, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, তুরস্কের যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে ফেরার সম্ভাবনা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন নতুন করে সামনে এসেছে। সম্মেলনের আগে জোটের মহাসচিব জানান, সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে আরও বৃহৎ পরিসরে অস্ত্র সংগ্রহ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ করবে। এর লক্ষ্য হলো দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জোটের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
বহুজাতিক অস্ত্র সংগ্রহে নতুন উদ্যোগ : সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য নজরদারি ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগের কথাও জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ইউক্রেনে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপেই যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে কয়েকটি দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভা-ারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে বাড়ছে উদ্বেগ :
শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ, অগ্নিকা- এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। ইউক্রেনের নেতৃত্ব জানিয়েছে, দেশের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি। তারা মিত্র দেশগুলোর কাছে দ্রুত আরও সামরিক সহায়তা চেয়েছে। সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন নেতা ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং আগামী বছরেও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন উত্তেজনা :
সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবারও দাবি করেন, আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অভিযোগ করেন, ডেনমার্ক দ্বীপটির নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই বক্তব্যের পরপরই ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, গ্রিনল্যান্ড কোনোভাবেই বিক্রির জন্য নয় এবং এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে একমাত্র সেখানকার জনগণ। তিনি বলেন, ডেনমার্ক নিজের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখ-তা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্বও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে জানায়, তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।
ইউরোপের সমর্থন ডেনমার্কের পাশে :
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ডেনমার্কের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের অখ-তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতির বিষয় এবং তা অবশ্যই সম্মান করা উচিত। তাদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সামরিক জোটের সমন্বিত কাঠামো বজায় রাখা, কোনো একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নয়।
তুরস্ককে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা :
সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশটিকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগে রাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে তুরস্ককে ওই কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ফলে সেই অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগও তৈরি করেছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চাপ :
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। তার অভিযোগ, বহু দেশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সম্মেলনে জোটের নেতৃত্ব জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্রগুলো উল্লেখযোগ্য হারে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ এই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্পেনকে ঘিরে নতুন বিরোধ :
সম্মেলনের আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল স্পেনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান। প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে মতপার্থক্যের জেরে স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। স্পেন অবশ্য এই অবস্থানকে গুরুত্ব না দিয়ে জানায়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর কারণে এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ নয়।
ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কোন পথে :
সম্মেলনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যÑ সব মিলিয়ে জোটকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের মাধ্যমে নিজেদের ঐক্য অটুট রাখারও চেষ্টা করছে।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার নতুন বার্তা :
আঙ্কারার এই শীর্ষ সম্মেলন কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক বৈঠক নয়; বরং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য নজিরবিহীন সামরিক বিনিয়োগ, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত মতবিরোধÑ দুই চিত্রই একই সঙ্গে সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু, ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির পরিবর্তন উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফলে আঙ্কারার এই সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য নয়, পুরো বিশ্বরাজনীতির জন্যই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

