মেরি লেনক্স ছিল ছোট্ট এক মেয়ে। তার জন্ম হয়েছিল ভারতে। তার বাবা-মা ধনী হলেও মেরির প্রতি তাদের কোনো ভালোবাসা বা সময় ছিল না। তাই মেরি বড় হয় একা! রাগী আর অভিমানী হয়ে। সে প্রায়ই কারো সঙ্গে কথা বলত না। হাসতও না। এমনকি খেলতও না। একদিন হঠাৎ এক ভয়ংকর রোগে তার বাবা-মা মারা যায়। মেরিকে পাঠানো হয় ইংল্যান্ডে তার কাকা মিস্টার ক্রেভেনের বাড়িতে। বিশাল সেই বাড়ি বাইরে থেকে সুন্দর হলেও ভেতরে ছিল নিস্তব্ধতা আর দুঃখে ভরা। কাকা নিজেও ছিলেন একা মানুষ। তিনি তার স্ত্রীকে হারিয়ে সব আনন্দ শেষ করে দিয়েছেন। মেরি প্রথমে এই নতুন পরিবেশকে একদমই পছন্দ করল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখতে শুরু করল। তখনই সে এক অদ্ভুত কথা শুনল এই বাড়ির পেছনে একটি বাগান আছে। যেটা বহু বছর ধরে বন্ধ। সেখানে কেউ যায় না। আর দরজাটা তালা দিয়ে বন্ধ করা। মেরির মনে কৌতূহল জন্মাল। সে ভাবল, এই বাগান আমি খুঁজে বের করবই। কিছুদিন পর সে বাগানের পুরোনো প্রাচীরের কাছে একটি ছোট্ট পাখির সাহায্যে কিছু খুঁজে পেল। মাটির নিচে লুকানো ছিল একটি পুরোনো চাবি! মেরির বুক ধকধক করতে লাগল। সে বুঝল এটাই সেই গোপন বাগানের চাবি। পরদিন মেরি চুপিচুপি বাগানের লোহার দরজার কাছে গেল। চারপাশ নিস্তব্ধ বাতাসে হালকা শীতলতা। সে কাঁপা হাতে চাবি ঢোকাল। ক্লিক! দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে মেরি থমকে গেল। পুরো বাগান শুকনো, মরা গাছ, ঝরা পাতা আর আগাছায় ভরা। কোথাও কোনো ফুল নেই। কোনো জীবন নেই।
মনে হলো যেন বাগানটি বহু বছর ধরে ঘুমিয়ে আছে। প্রথমে মেরি দুঃখ পেল কিন্তু তার ভেতরে এক ধরনের দায়িত্ববোধ জন্মাল। সে ভাবল, এই বাগানকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে হবে! সেই দিন থেকে মেরি প্রতিদিন লুকিয়ে বাগানে যেতে শুরু করল। সে মাটি খুঁড়ত, শুকনো ডাল সরাত, পানি দিত, আর আগাছা পরিষ্কার করত। ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হলো। মাটির নিচ থেকে ছোট ছোট সবুজ অঙ্কুর বের হতে লাগল। কিছু জায়গায় ফুলের কুঁড়িও দেখা দিল। একদিন মেরি এক অসুস্থ ছেলের দেখা পেল। তার নাম কলিন। সে ছিল খুব দুর্বল। সে সবসময় বিছানায় শুয়ে থাকত এবং বিশ্বাস করত যে, সে কখনো হাঁটতে পারবে না। সে খুব রাগীও ছিল। সবাইকে ভয় দেখাত। মেরি প্রথমে কলিনকে পছন্দ করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝল, কলিন আসলে ভীত এবং একা। মেরি তাকে বলল, তুমি চাইলে আমি তোমাকে একটা গোপন জায়গা দেখাতে পারি। কলিন অবাক হলো। কৌতূহলবশত সে রাজি হলো।
মেরি তাকে হুইলচেয়ারে করে বাগানে নিয়ে গেল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কলিন চমকে উঠল। চারদিকে সবুজ গাছ, ফুলের গন্ধ, পাখির ডাকÑসব মিলিয়ে এক জাদুকরী পরিবেশ। সে প্রথমবারের মতো প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করল। মেরি বলল, এই বাগানটা ধীরে ধীরে আবার সুবজ হতে শুরু করেছে। বাগানটি আবার বেঁচে উঠছে। কলিনের ভেতরে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। সে আর আগের মতো ভয় পেত না। সে বাগানে বসে বাতাস অনুভব করত। ফুল ছুঁয়ে দেখত। দিন যেতে লাগল। মেরি আর কলিন প্রতিদিন বাগানে কাজ করত। তারা মাটি খুঁড়ত, গাছ লাগাত, পানি দিত। বাগান যেমন সবুজ হতে লাগল, তেমনি তাদের মনও বদলে যেতে লাগল। মেরির রাগ কমে গেল, সে হাসতে শিখল। কলিনও ধীরে ধীরে শক্তি পেতে শুরু করল। একদিন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। কলিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
প্রথমে তার পা কাঁপছিল, কিন্তু মেরির সাহস আর নিজের বিশ্বাস নিয়ে সে এক পা এগোল... তারপর আরেক পা... এবং অবশেষে সে হাঁটতে শুরু করল! সে হাঁটছে নিজের পায়ে! মেরি আনন্দে চিৎকার করে উঠল। বাগান যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিছুদিন পর মিস্টার ক্রেভেন এই খবর শুনে ছুটে এলেন। তিনি দেখলেন তার ছেলে হাঁটছে, হাসছে, আর মেরির সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। তার চোখে পানি চলে এলো। মিস্টার ক্রেভেন বুঝতে পারলেন, এই গোপন সবুজ বাগান! শুধুমাত্র নামে একটি বাগান নয়! এই গোপন বাগান মানুষের জীবনও পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম। সেদিনের পর থেকে গোপন বাগান আর গোপন রইল না! গোপন বাগান হয়ে উঠল ভালোবাসা! আশা আর নতুন জীবনের প্রতীক!

