নদী বা পুকুরে মা-হাঁসের পেছনে একঝাঁক ছানার সারি বেঁধে সাঁতার কাটার দৃশ্য সবারই চেনা। তবে এই চিরাচরিত অভ্যাসের পেছনে কেবল কোনো পারিবারিক বন্ধন নয়, বরং রয়েছে এক নিখুঁত বিজ্ঞান। এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁসের ছানারা মূলত মায়ের সাঁতার কাটার ফলে তৈরি হওয়া পানির ঢেউয়ের ওপর ভর করে চলে, যা তাদের সাঁতার কাটার শক্তি অনেকাংশে বাঁচিয়ে দেয়। গবেষকরা জানান, পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে হাঁসের ছানারা মায়ের পেছনে থাকলে সাঁতার কাটতে কম শক্তি খরচ করে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, একটি হাঁস যখন পানিতে একা সাঁতার কাটে, তখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার পেছনে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হয়। এই ঢেউ তৈরি করতে হাঁসের নিজের শরীরের শক্তি খরচ হয়, যা পানির ভেতরে এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করে এবং হাঁসের গতি কমিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা এই প্রভাবকে ‘ওয়েভ ড্রাগ’ বা ঢেউয়ের বাধা বলে অভিহিত করেছেন। তবে হাঁসের ছানারা যখন মায়ের পেছনে ঠিকঠাক দূরত্ব বজায় রেখে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে, তখন এই হিসাবটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। মা-হাঁস সাঁতার কাটার সময় যে ঢেউ তৈরি করে, তা পেছনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ছানারা যদি সেই ঢেউয়ের সঠিক অবস্থানে বা ‘সুইট স্পটে’ থাকে, তবে সেই ঢেউ তাদের জন্য আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
উল্টো, ঢেউটি ছানাগুলোকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। ফলে ছানাদের নিজেদের খুব একটা শক্তি খরচ করতে হয় না। এই সুবিধাটি কেবল প্রথম ছানাটিই পায় না, বরং সারিতে থাকা প্রতিটি ছানাই একে অপরকে সাহায্য করে। সামনে থাকা ছানাটি যখন মায়ের ঢেউয়ের সাহায্যে এগোয়, তখন সে নিজের অজান্তেই তার পেছনে আরেকটি ছোট ঢেউ তৈরি করে। এই ঢেউটি আবার তার ঠিক পেছনে থাকা পরবর্তী ছানাটিকে সামনে ঠেলে দেয়। এভাবে পুরো দলটাই একে অপরের তৈরি করা গতিকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত কম শক্তি খরচ করে দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটতে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রাকৃতিক সুবিধার একটি বড় শর্ত হলো শৃঙ্খলা। যদি কোনো ছানা সঠিক অবস্থান থেকে সামান্য সরে যায় বা দল থেকে পিছিয়ে পড়ে, তবে সে আর এই ‘ম্যাজিক ঢেউয়ের’ সুবিধা পায় না। তখন তাকে পানির তীব্র বাধার বিরুদ্ধে নিজের শক্তিতে সাঁতার কাটতে হয়, যা তার জন্য অত্যন্ত ক্লান্তিকর। প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মেই হাঁসের ছানারা মায়ের পেছনে সর্বদা সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধভাবে চলতে বাধ্য হয়।

