ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

রাসনা ও ছোট্ট শিম্পাঞ্জি

আব্দুস সালাম
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৫৬ এএম

ছোট্ট রাসনা দাদার হাত ধরে বলল, ‘দাদা, আজ আমাকে একটা গল্প শোনাও না!’ দাদা হেসে বললেন, ‘কিসের গল্প শুনতে চাও?’ রাসনা একটু ভেবে বলল, ‘আজ আমি শিম্পাঞ্জির গল্প শুনব।’ দাদা চশমাটা ঠিক করে গল্প শুরু করলেন।

‘অনেক দূরে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার সবুজ বনে থাকত এক ছোট্ট শিম্পাঞ্জি। তার নাম ছিল টুকু। টুকুর চোখ দুটি ছিল কৌতূহলে ভরা, আর মাথা ছিল বুদ্ধিতে ঠাসা। সে গাছের ডালে ডালে লাফাত, বন্ধুদের সঙ্গে খেলত, আবার নতুন কিছু দেখলেই মন দিয়ে শিখত।’ রাসনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদা, শিম্পাঞ্জি দেখতে কেমন?’ দাদা বললেন, ‘শিম্পাঞ্জির বাহু পায়ের চেয়ে লম্বা। তাই তারা সহজে গাছের ডালে ঝুলতে পারে। তাদের সারা শরীর বাদামি বা কালো রঙের ঘন লোমে ঢাকা থাকে। তবে মুখ, হাতের তালু আর পায়ের তলা অনেক সময় কালো বা হালকা রঙের হয়।’ রাসনা বলল, ‘ওরা কি খুব বুদ্ধিমান?’ দাদা মাথা নেড়ে বললেন, ‘অবশ্যই। শিম্পাঞ্জি মানুষের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় প্রাণীদের একটি। তারা খুব বুদ্ধিমান। মানুষের মতো ওদেরও আনন্দ, দুঃখ আর রাগ আছে। কেউ কষ্ট পেলে আরেকজন তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত¡না দেয়।’ রাসনা মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘তাহলে টুকুও কি তার বন্ধুদের সান্ত¡না দিত?’ দাদা বললেন, ‘হ্যাঁ। একদিন টুকুর বন্ধু মিমি গাছ থেকে নামতে গিয়ে ভয় পেয়ে গেল। টুকু তার পাশে গিয়ে আলতো করে হাত রাখল। যেন বলল, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’ তারপর মিমি ধীরে ধীরে নেমে এলো।’ রাসনা খুশি হয়ে বলল, ‘দাদা, শিম্পাঞ্জি কি হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে?’ দাদা বললেন, ‘হ্যাঁ, পারে। টুকু একদিন দেখল, একটি গাছের ফাঁকে উইপোকা আছে। সে সরু একটি ডাল নিয়ে ফাঁকের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর ডালটি বের করতেই তাতে উইপোকা লেগে এল। আবার বাদাম ভাঙার সময় তারা পাথর ব্যবহার করত। কী বুদ্ধি, বলো তো!’ রাসনা হাততালি দিয়ে বলল, ‘বাহ! টুকু তো সত্যিই চালাক।’ দাদা আবার বলতে লাগলেন, ‘টুকুর বন ছিল খুব সুন্দর। সেখানে ছিল বড় বড় গাছ, লতাপাতা, ঝোপঝাড় আর দূরে সবুজ তৃণভূমি। শিম্পাঞ্জিরা মূলত আফ্রিকার ক্রান্তীয় বৃষ্টিপ্রধান অরণ্য, বনভূমি ও তৃণভূমিতে বাস করে।’ রাসনা জিজ্ঞেস করল, ‘তারা রাতে কোথায় ঘুমায়?’ দাদা বললেন, ‘শিম্পাঞ্জিরা গাছের ডালে ডালপালা আর পাতা দিয়ে বাসা বানায়। টুকুও প্রতিদিন সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে গাছের ওপর নিরাপদ বাসা বানিয়ে ঘুমাত। বাতাস এলে পাতাগুলো নরম শব্দ করত, আর টুকু ভাবত, বন যেন তাকে লোরি শোনাচ্ছে।’

রাসনা বলল, ‘দাদা, শিম্পাঞ্জিরা কী খায়?’ দাদা উত্তর দিলেন, ‘তারা সর্বভুক। তাদের প্রধান খাবার হলো বন্য ফল, গাছের পাতা, বীজ, বাদাম আর ফুল। তবে তারা উইপোকা, পিঁপড়া ও পাখির ডিমও খায়। কখনো কখনো ছোট প্রাণীও শিকার করে।’ ‘টুকুর সবচেয়ে প্রিয় খাবার কী ছিল?’ রাসনা জানতে চাইল। দাদা হেসে বললেন, ‘পাকা মিষ্টি ফল। একদিন টুকু একটা ফল পেল। কিন্তু নিজে সব খেয়ে ফেলল না। সে মিমির সঙ্গে ভাগ করে খেল। তখন দলের বড় শিম্পাঞ্জি তাকে দেখে বলল, ‘ভাগ করে খেতে শেখা বড় গুণ, টুকু।’

রাসনা বলল, ‘শিম্পাঞ্জিরা কি একা থাকে?’ দাদা বললেন, ‘না, তারা খুব সামাজিক প্রাণী। তারা ১৫ থেকে ১২০টি শিম্পাঞ্জি নিয়ে বড় দল বা কমিউনিটি গঠন করে। পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা সাধারণত সারাজীবন নিজের দলেই থাকে।’ রাসনা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তাদের দলে কি নেতা থাকে?’ দাদা বললেন, ‘হ্যাঁ, থাকে। শিম্পাঞ্জিদের দল সাধারণত পুরুষ-অধ্যুষিত হয়। একটি শক্তিশালী পুরুষ শিম্পাঞ্জি দলের নেতা হিসেবে সবাইকে পথ দেখায়। তবে ভালো নেতা শুধু শক্তিশালী হলেই হয় না, তাকে বুদ্ধিমান ও দায়িত্বশীলও হতে হয়।’ দাদা গল্প এগিয়ে নিলেন, ‘টুকুদের দলে এক নেতা ছিল, নাম বুরো। সে সবাইকে নিরাপদ পথে নিয়ে যেত। কোনো বিপদ দেখলে সবাইকে সতর্ক করত। একদিন দূরে ঝড়ের কালো মেঘ দেখে বুরো ডাক দিল। সবাই দ্রুত উঁচু গাছের নিরাপদ ডালে উঠে গেল।’ রাসনা বলল, ‘দাদা, গ্রুমিং কী?’ দাদা বললেন, ‘গ্রুমিং মানে একে অপরের শরীর থেকে উকুন ও ময়লা পরিষ্কার করা। শিম্পাঞ্জিরা প্রতিদিন এটি করে। এতে তারা পরিষ্কার থাকে, আবার তাদের বন্ধুত্বও মজবুত হয়।’ রাসনা মিষ্টি হেসে বলল, ‘মানে যেমন মা আমার চুল আঁচড়ে দেয়?’ দাদা বললেন, ‘ঠিক তাই। যতœ করলে ভালোবাসা বাড়ে। টুকু যখন মিমির শরীর থেকে ময়লা পরিষ্কার করত, মিমিও পরে টুকুকে সাহায্য করত। এভাবেই তাদের বন্ধন আরও দৃঢ় হতো।’

রাসনা শেষ প্রশ্ন করল, ‘দাদা, শিম্পাঞ্জিরা কত বছর বাঁচে?’ দাদা বললেন, ‘বন্য পরিবেশে তারা সাধারণত ৪৫ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।’ গল্প শেষ করে দাদা বললেন, ‘তাই দেখলে, রাসনা, শিম্পাঞ্জি শুধু বনের প্রাণী নয়; তারা বুদ্ধিমান, অনুভূতিশীল ও সামাজিক। তারা আমাদের শেখায়Ñ একসঙ্গে থাকা, বন্ধুকে সাহায্য করা, খাবার ভাগ করে খাওয়া আর প্রকৃতিকে ভালোবাসা কত জরুরি।’

রাসনা দাদার হাত ধরে বলল, ‘দাদা, আজ থেকে আমিও টুকুর মতো বন্ধুদের সাহায্য করব, ভাগ করে খেতে শিখব, আর প্রাণীদের ভালোবাসব।’ দাদা মৃদু হেসে বললেন, ‘এই তো আমার ছোট্ট বুদ্ধিমতী রাসনা।’