বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার নামে কিছু অনুমোদনহীন ও অসাধু প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘ফরেন অ্যাডমিশন এন্ড ক্যারিয়ার ডেভলপমেন্ট কনসালট্যান্টস অফ বাংলাদেশ (এফএসিডি-ক্যাব)’।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এফএসিডি-ক্যাবের সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়। পাশপাশি বৈদেশিক উচ্চশিক্ষা পরামর্শদান খাতকে বাঁচাতে কোন মন্ত্রণালয়ের অধিনে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এফএসিডি-ক্যাব নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে যৌথভাবে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সংগঠনের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী জুয়েল ও সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি বশির আহমেদ, এফবিসিসিআইয়ের নেতা মো. আতিকুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোলায়মান।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, এফএসিডি-ক্যাব শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনার বিষয়ে দেশের ‘ওভারসিজ স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং’ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন হিসেবে প্রায় দুই যুগ ধরে কাজ করছে। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অবারিত করা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে দেশের বৈদেশিক উচ্চশিক্ষা পরামর্শদান খাতটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। কিন্তু এফএসিডি-ক্যাবের অনিবন্ধিত কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি ও প্রতারণায় তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।
এ ছাড়া এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে যারা শিক্ষা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সেবা দিয়ে গেলেও এই এফএসিডি-ক্যাব সংগঠনটি কোন মন্ত্রণালয়ের অধিনে থেকে কাজ করবে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সরকারের কোন দপ্তরের কোন ধরণের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কোনমতে একটি ট্রেড লাইসেন্স যোগাড় করেই দেদারসে টাকা লুটে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে নামসর্বস্ব স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দক্ষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারি কর্তৃপক্ষ না থাকায় সঠিক তদারকি হচ্ছে না, অবহেলা ও অবিশ্বস্ততায় হারাচ্ছে খাতটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
বৈদেশিক উচ্চ শিক্ষা পরামর্শদান খাতে সুশাসন ও পেশাগত ও মান নিশ্চিত করতে এফএসিডি-ক্যাবের সদস্য কাউন্সেলিং প্রতিষ্টানগুলোর জন্য প্রণীত আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ ও তদারকিসহ সাতটিটি সুপারিশ করা হয়। অন্যদিকে প্রতারক কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাঁদে না পড়তে শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের প্রতিও বেশকিছু সুপারিশ করা হয়।
এর মধ্যে টিউশন ফি ব্যাংকিং চ্যানেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোসহ চারটি সুপারিশ রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার্থী সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা পরামর্শদান ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে নয়টি সুপারিশ করা হয়।
এসব সুপারিশের মধ্যে অন্যতম- বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিদ্যমান স্মার্ট নিবন্ধন ব্যবস্থার আদলে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্ট রেজিস্ট্রেশন এবং স্মার্ট স্টুডেন্ট আইডি সিস্টেম চালু করা; ফরেন এডুকেশন কনসালটেন্সি অ্যাক্ট প্রণয়ন; বাধ্যতামূলক জাতীয় লাইসেন্সিং, রেজিস্ট্রেশন এবং এক্রিডিটেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রবর্তন করে শুধুমাত্র অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া ইত্যাদি।
এ বিষয়ে এফএসিডি-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি-প্রতারণায় যুক্ত তারা এফএসিডি-ক্যাবের নিবন্ধিত নয়। তাই তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছা থাকলেও আমাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয় না’।
তবে নিবন্ধিত কোন প্রতিষ্ঠান দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এফএসিডি-ক্যাব সকলধরণের সাহায্য নিয়ে ভুক্তভোগির পাশে দাঁড়াবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন প্রেসিডেন্ট।
কাউন্সেলিং প্রতিষ্টানগুলোর জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জোরালো যোগাযোগের তাগিদ দেন এফবিসিসিআই নেতা মো. আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিদেশে স্টুডেন্ট বেশি পাঠাতে পারলে দেশে রেমিটেন্স আসা যেমন বাড়বে তেমনি আমাদের পেশাজিবীও তৈরি হবে’।
এফএসিডি-ক্যাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি বশিল আহমেদ বলেন, ‘যে কোন মন্ত্রলণালয়ের অধিনে এফএসিডি-ক্যাবকে নিবন্ধন করে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক উচ্চশিক্ষা পরামর্শদান খাতকে শিল্পে র্যপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে একজন প্রবাসী শ্রমিক যে পরিমান রেমিটেন্স পাঠায় তার চেয়ে অনেক বেশি পাঠায় বিদেশে পড়ুয়া একজন স্টুডেন্ট। পাশপাশি সেই স্টুডেন্ট নিজের ভবিষ্যত গড়ার ক্ষেত্রেও প্রভুত উন্নতি অর্জন করে’।
জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে, শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরো সুদৃঢ় করতে একটি কার্যকর নীতিমালা ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্টার জন্য সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এফএসিডি-ক্যাব নেতৃবৃন্দ।

