টেলিভিশনের পর্দায় যাদের কণ্ঠস্বর আর পরিশীলিত উপস্থাপনা আমাদের প্রতিদিনের খবরের জগৎকে প্রাণবন্ত করে তোলে, রুবাইয়াৎ অদিতি তাদের মধ্যে অন্যতম। তবে এই পথচলাটা কোনো পূর্বপরিকল্পিত ছক ধরে নয়, বরং সহজাত প্রতিভা আর পরিশ্রমের এক অপূর্ব সমন্বয়। স্কুল-কলেজের মঞ্চ থেকে শুরু করে আজকের নিউজ ডেস্ক, অদিতি নিজেকে গড়ে তুলেছেন আপন মহিমায়। পারিবারিক আবহে শুদ্ধ উচ্চারণের হাতেখড়ি আর আবৃত্তির ছন্দে কণ্ঠের কারুকাজ রপ্ত করা এই গুণী ব্যক্তিত্ব বিশ্বাস করেন, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বরং বিতর্ক আর উপস্থিত বক্তৃতার মতো সৃজনশীল কাজই একজন সংবাদ উপস্থাপককে পূর্ণতা দেয়। ২০০৭ সালে ক্যারিয়ার শুরু করা অদিতির কাছে প্রতিটি দিনই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক নতুন চ্যালেঞ্জ। নিজের ক্যারিয়ার, সংবাদ উপস্থাপনার খুঁটিনাটি সব বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। যেখানে উঠে এসেছে তার ক্যারিয়ারের শুরু, পর্দার পেছনের প্রস্তুতি এবং নতুনদের জন্য তার মূল্যবান পরামর্শ। সফল নিউজ প্রেজেন্টার হয়ে ওঠার সেই নেপথ্যের গল্প শোনাচ্ছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন
নিউজ প্রেজেন্টার হওয়ার স্বপ্নটা আপনার কীভাবে শুরু হয়েছিল?
স্কুল-কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করা হতো নিয়মিত। ঠিক নিউজ প্রেজেন্টারই যে হব, সে প্ল্যান ছিল না। ঘটনাচক্রে আজকের এই অবস্থান।
এই পেশায় আসতে আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে কী বা কে?
আমার বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা সবসময়ই ছিল। আমার ভেতরের যেকোনো ভালো দিক সামনে নিয়ে আসতে তারা সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। একই সঙ্গে আমার স্কুলের শিক্ষকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা শুধু পড়ালেখা নয়, বরং অন্য আরও অনেক কিছুতেই যে যুক্ত হওয়া যায়, সেই পথ দেখিয়েছেন।
নিউজ প্রেজেন্টার হতে কী ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি কাজে আসে?
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যে বিষয়েই হোক না কেন, তার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যক্টিভিটি জরুরি। বিশেষ করে বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতার অভিজ্ঞতা বেশ কাজে লাগে। এ ছাড়াও যেটা জরুরি তা হলো, বিভিন্ন কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সে আপডেটেড থাকা।
পড়াশোনার বাইরে নিজেকে প্রস্তুত করতে কী কী করেছেন?
ভালো প্রেজেন্টেশনের খুঁটিনাটি খেয়াল করতাম আমি খুব। আমার উচ্চারণ পারিবারিকভাবেই ভালো একদম ছোটবেলা থেকেই। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল। আবৃত্তি করতাম প্রচুর; যা আমাকে কণ্ঠের ওঠানামা, উচ্চারণে আবেগের ব্যবহার শিখিয়েছে।
মিডিয়া বা সাংবাদিকতা বিষয়ে ট্রেনিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ট্রেনিং কাজে আসে যদি ধৈর্য ও মনোযোগসহ লেগে থাকা যায়। আমি কোথাও সেভাবে কোনো কোর্স করিনি। তবে পরবর্তী সময়ে নিজে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। তখন আমি লক্ষ করেছি যে ভালো ট্রেনিং অনেকখানি সাহায্য করে। তবে অবশ্যই কিছু গুণ পরিবার, এলাকা কিংবা ছোটবেলার সাথীদের কাছ থেকেও আসে।
একজন সফল নিউজ প্রেজেন্টারের জন্য কোন স্কিলগুলো সবচেয়ে জরুরি?
আমি নিজে সফল কিনা, বা কতটুকু সফল, তা দর্শক বলবে; তবে স্কিল নিয়ে বলতে হলে আমি বলব, উচ্চারণ থেকে আঞ্চলিক টান দূর করাটা আমাদের দেশে বড় চ্যালেঞ্জ। এই স্কিলটা ডেভেলপ করা ভীষণ জরুরি।
শুদ্ধ উচ্চারণ ও ভয়েস মডুলেশন কীভাবে উন্নত করা যায়?
এর জন্য প্রচুর পড়ার অভ্যাস থাকলে খুব সুবিধা হয়। জোরে জোরে আওয়াজ করে সংবাদপত্র পড়া যেতে পারে। আর আগেই যেমন বলছিলাম, বিতর্ক-আবৃত্তি এসব কাজে দেয়।
ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য আপনি কী অনুশীলন করতেন?
আমার আসলে ক্যামেরা শাইনেস কোনোকালেই ছিল না। ছাত্রজীবন থেকেই অনেক স্টেজ শো করার কারণে আত্মবিশ্বাসে কখনো কমতি হয়নি। তবে পরামর্শ হিসেবে বলব, কারো সামনে প্র্যাক্টিস করার কথা। নিজের ভুল নিজে চিহ্নিত করা যায় না। তাই হেজিটেশন ভুলে কাউকে দর্শক ও সমালোচক হিসেবে সামনে রেখে প্র্যাক্টিস করলে উপকার পাওয়া যায়।
ক্যারিয়ারের শুরুতে কী ধরনের বাধার মুখোমুখি হয়েছেন?
বাধা মূলত একটু অভিজ্ঞতা হওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে। নিজের পারফরমেন্সকে নিজেই চ্যালেঞ্জ করা, নিজেকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকা, এগুলোর বাইরে আমাকে খুব বেশি বাধা ডিঙাতে হয়নি। আমি সবসময়ই আমার কাজ দিয়ে আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুকূলেই পেয়েছি।
প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আমার প্রথমবারের অভিজ্ঞতা কিন্তু নিউজ প্রেজেন্টেশন ছিল না। আমি ২০০৭ সালে ক্যামেরার সামনে প্রথম কাজ করি প্রোগ্রাম প্রেজেন্টেশনে। তবে সেটা ফোনো লাইভ প্রোগ্রাম ছিল বলে এক্সাইটমেন্ট ছিল চূড়ান্ত।
লাইভ নিউজ প্রেজেন্টেশনে চাপ কীভাবে সামাল দেন?
বিশ্বের এবং জাতীয় পর্যায়ের সংবাদের আপডেট খোঁজখবর রাখতে হয়। তথ্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নয়, অথেন্টিক তথ্য নিশ্চিত হতে হয়। তা হলেই আর অতটা চাপ হয় না।
একজন নিউজ প্রেজেন্টারের দৈনন্দিন কাজের রুটিন কেমন হয়?
আমাদের রুটিনটা নির্ভর করে কোন কোন নিউজ আজ আছে, তার ওপর। যেহেতু আমি নিউজ চ্যানেলে চাকরি করি, আর এখানে কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে নয়, বরং সারা দিনই নিউজ। তাই আমাদের রোস্টারের মাধ্যমে ডিউটি ভাগ করে দেওয়া হয়। সেই রোস্টারের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করেই আমাদের অন্য সব কাজের প্ল্যান করতে হয়।
নিউজ পড়ার আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেন?
প্রেজেন্টারকে যেহেতু প্রেজেন্টেবল হতে হয়, তাই অবশ্যই নিজেকে একটু সাজিয়ে নিতে হয়। তারপর হাতে একটু সময় রাখা জরুরি যেন স্টুডিওতে যাওয়ার আগে একটু পড়ে নেওয়া যায় যে আজ কোন কোন খবরগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
ভুল হলে বা হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে গেলে কীভাবে সামলে নেন?
ভুল হলে ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। তারপর সঠিক তথ্যটি উপস্থাপন করা ভালো। আর হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে গেলে, নিউজরুম থেকে আপডেটেড হতে হবে তৎক্ষণাৎ।
নতুনদের জন্য এই পেশায় ঢোকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?
এক্ষেত্রে নিউজ চ্যানেলগুলোর জব সার্কুলার খেয়াল রাখা ভালো। বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারগুলোও তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য এমন খোঁজখবর নেয়।
অডিশন বা ক্যামেরা টেস্টে সফল হওয়ার টিপস কী?
আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে চেহারার অভিব্যক্তি ঠিকঠাক থাকছে কিনা।
নতুনরা কী ভুলগুলো বেশি করে যা এড়িয়ে চলা উচিত?
নতুনদের উচিত স্বকীয়তা ধরে রেখে উপস্থাপনা করার চেষ্টা করা। তবে পাশাপাশি খুব বেশি এক্সপেরিমেন্টাল না হওয়া শুরুর দিকে।
ভবিষ্যতে নিউজ প্রেজেন্টিং পেশার সুযোগ কেমন দেখছেন?
এই পেশার ভবিষ্যৎ ভালো কারণ এখন কেবল টিভি চ্যানেলের ওপর নির্ভর করতে হয় না। অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ভালো সুযোগ দিচ্ছে নতুনদের।
এই পেশায় দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে কী করা উচিত?
যেকোনো পেশার মতোই নিউজ প্রেজেন্টেশনেও দরকার অধ?্যাবসায়। নিজেকে সময়ের সঙ্গে মানানসই করতে হবে। আর কিছুটা যতœ নিতে হবে নিজের কণ্ঠেরও।
যারা এখন শুরু করতে চায়, তাদের জন্য আপনার শেষ পরামর্শ কী?
প্রেজেন্টেশন একটা গ্রেসফুল ফিল্ড। এখানে শর্টকাট খোঁজার চেষ্টা না করাই ভালো। উচ্চারণ ও এক্সপ্রেশন সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, এখানটায় কম্প্রোমাইজ করলে বেশিদূর এগোনো সম্ভব না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন