ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

তারুণ্যের অনুপ্রেরণা কাজী নজরুল ইসলাম

স্বপ্নবাজ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৬:৪৩ এএম

নজরুল মানেই তারুণ্যের দীপ্ত প্রতীক। নজরুল মানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক সত্তা। তিনি তরুণদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, কীভাবে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে হয়। তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কেবল কাগজের বুকে কিছু শব্দ নয়, এটি ছিল তৎকালীন পরাধীন যুবসমাজের সুপ্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক তীব্র হাহাকার ও হুঙ্কার। কবি বিশ^াস করতেন, তরুণদের ভেতরের অপ্রতিরোধ্য শক্তিই পারে সমাজের সব জরাজীর্ণতা, ভীরুতা ও বৈষম্যকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। নজরুলের এই বিদ্রোহী সত্তা আজকের তরুণদের শেখায় প্রতিকূল পরিবেশেও দমে না গিয়ে নিজের ভেতরের শক্তিকে বিশ^াস করতে।

সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার চিরন্তন শিক্ষা

আজকের আধুনিক তরুণ প্রজন্মের জন্য নজরুলের সবচেয়ে বড় এবং প্রাসঙ্গিক শিক্ষা হলো তার সাম্যবাদী চিন্তাধারা। তিনি জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ বা লিঙ্গের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে কেবলই ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছেন।  তিনি লিখেছেনÑ

“গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রীষ্টান।”

যুবসমাজকে একটি বৈষম্যহীন, উদার এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে নজরুলের এই আদর্শ প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করে। তিনি তরুণদের সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে এক বিশাল উদার হৃদয়ের অধিকারী হতে আহ্বান জানিয়েছেন।

তারুণ্যের গান ও কর্মচঞ্চলতার উদ্দীপনা

নজরুল তার কবিতা, গান ও প্রবন্ধে তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তার রচিত ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি আমাদের রণসংগীত, যা তরুণদের প্রতিনিয়ত সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। ‘ছাত্রদলের গান’-এ তিনি তরুণদের উদ্দেশ্য করে বলেছেনÑ

“আমরা শক্তি আমরা বল/ আমরা ছাত্রদল।/ মোদের পাছের মরণ-বাঁচন হিয়া টলমল।”

নজরুল তরুণদের অলসতা, জড়তা ও ভীরুতা ঝেড়ে ফেলে কর্মচঞ্চল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যুবসমাজকে খাঁচায় বন্দি তোতাপাখি না হয়ে, ঝড়ের বুকে ডানা মেলে উড়ে চলা ‘ঝড়ের পাখি’ হওয়ার দীক্ষা দিয়েছেন। যেকোনো সামাজিক দুর্যোগ, মহামারি বা সংকটে তরুণরা যখন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন নজরুলের এই কর্মোদ্দীপনার বাণীই তাদের প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

নজরুলের তারুণ্যের মূলমন্ত্র

জড়তা ও অলসতা পরিহার করা। সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা। ভাঙনের মধ্য দিয়ে নতুনকে গড়া।

অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই

নজরুল শুধু কাগজের পাতায় কলম চালাননি, বরং নিজের বাস্তব জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন কীভাবে শৃঙ্খল ভাঙতে হয়। ব্রিটিশ রাজশক্তির শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠও তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ দিয়ে তিনি বিশ^কে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সত্যের পথে থাকলে কোনো ভয় বা কারাগারের লোহার প্রাচীর তরুণদের আত্মাকে আটকে রাখতে পারে না।

ভালোবাসার কোমলতা ও মানবিক মূল্যবোধ

নজরুল একদিকে যেমন ‘বজ্র’, অন্যদিকে তেমন ‘কুসুম’। তার প্রেম, বিরহ, আর প্রকৃতির গান ও কবিতাগুলো তরুণ হৃদয়কে করে তোলে সংবেদনশীল, নমনীয় ও মানবিক। তিনি তরুণদের শিখিয়েছেন নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, অবহেলিত মানুষকে বুকে টেনে নিতে এবং ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দিতে। এই মানবিক মূল্যবোধই একজন তরুণকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

তারুণ্যের চোখে নতুন সৃষ্টির আনন্দ

নজরুল ছিলেন ভাঙনের কবি, কিন্তু সেই ভাঙন ছিল নতুনের সৃষ্টির জন্য। তিনি বিশ^াস করতেন, পুরাতন যা কিছু পচা, জরাজীর্ণ এবং প্রগতির পরিপন্থি তা ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে। আর এই ভাঙনের কাজ কেবল তরুণরাই করতে পারে। তরুণদের মাঝে যে নতুন কিছু সৃষ্টি করার, নতুন পথ তৈরি করার এবং উদ্ভাবনী চিন্তা করার ক্ষমতা থাকে, নজরুল তাকে সবসময় স্যালুট জানিয়েছেন।

যতদিন এই পৃথিবীতে অন্যায় থাকবে, যতদিন শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়োজন হবে, ততদিন নজরুল থাকবেন তরুণদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, দিকনির্দেশক এবং অন্তহীন শক্তির উৎস। আজকের তরুণ প্রজন্ম যদি নজরুলের আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যায়, তবে একটি সুন্দর, সাম্যময় এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশ ও বিশ^ গড়ে তোলা সম্ভব। নজরুলের তারুণ্যের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের আগামী প্রজন্ম।