বাংলাদেশের বিমা খাত বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ বীমা কোম্পানি বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় ১৫ লাখ বিমাগ্রহীতা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে দাবি নিষ্পত্তি না হওয়ায় খাতটিতে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নন-লাইফ বিমা খাতে সাধারণ বিমা কর্পোরেশন থেকে প্রিমিয়াম আদায় সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পরও কাঙ্খিত উন্নতি আসেনি। বরং খাতটির গ্রস প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় রয়ে গেছে।
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা ও বীমা খাতকে টেকসই করার লক্ষ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলো একীভূত করার উদ্যোগ, সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম জোরদার করা এবং জনবল দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা। সে লক্ষ্যে কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন ও নবায়ন ফি নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। গত সাত বছর ধরে কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজারে মোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা করে দিয়ে আসছিল।
তবে চলতি ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজারে মোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে দেড় গুণ বাড়িয়ে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরদিকে ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ পর্যন্ত তিন গুণ বাড়িয়ে ৪.০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০৩২ এবং পরবর্তী সময়ের জন্য বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি চার গুণ বাড়িয়ে ৫.০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইডিআরএ থেকে নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিয়ে দেশের যে ৩৫টি জীবনবিমা ও ৪৫টি সাধারণ বিমা (নন-লাইফ) কোম্পানি ব্যবসা করছে, তাদের ওপর এই নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রযোজ্য হবে।
আইডিআরএর প্রস্তাব মেনে মাশুল বাড়ানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’ সংশোধনের কাজ করছে আট মাস আগে থেকে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলছে, বৃদ্ধির হার ৪ গুণ বাড়িয়ে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে ২০২৫ সালের ১ জুলাই। পরে অবশ্য বছরওয়ারি হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত মাসে এই খসড়া ভেটিং বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয় ভেটিং শেষে গত সপ্তাহে তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ফেরত পাঠায়। এরপর আবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সর্বশেষ গত ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজার মোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে দেড় গুণ বাড়িয়ে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরদিকে ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ পর্যন্ত তিন গুণ বাড়িয়ে ৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে নিবন্ধন নবায়ন ফি। এ ছাড়া ৩০৩২ ও পরবর্তী সময়ের জন্য বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি চার গুণ বাড়িয়ে ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ফি বাড়ানো হয়েছে ০.৫ শতাংশ হারে। এই মাশুলের নাম ‘নিবন্ধন নবায়ন মাশুল’। বিদ্যমান বিধিমালা ২০১২ সালে জারি হওয়ার সময় নিবন্ধন নবায়ন মাশুল ছিল প্রতি হাজার মোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে ৩ দশমিক ৫ টাকা। ২০১৮ সালের ১১ জুন তা সংশোধন করে ১ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এখন আবার বছরভিত্তিক তিন স্তরে এই হার সংশোধন করা হয়েছে।
একটি জীবনবিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এমনিতেই বিমা কোম্পানিগুলোর অবস্থা ভালো নয়। ব্যবসার প্রবৃদ্ধি নেই। তার ওপর বাড়তি হারে নিবন্ধন নবায়নের মাশুল দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হতে পারে না। আইডিআরএ প্রিমিয়াম আয়ের ওপর প্রতি হাজারে ২ দশমিক ৫ শতাংশ মাশুল এ বছরের বদলে বরং ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করতে পারলে খুব ভালো হতো।
আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পুনর্বীমা বা বিনিয়োগ আয়ের ওপর কোনো চার্জ আরোপ করা হয় না। অথচ বীমা কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করে, সেখানে আইডিআরএ এতদিন মাত্র ১০ পয়সা পেয়ে আসছিল, যা এখন সংশোধন করে ২৫ পয়সা করা হয়েছে। সংশোধিত ফি কাঠামো ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে।
বর্তমানে আইডিআরএর বার্ষিক আয় প্রায় ১২ কোটি টাকা, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, “সংশোধনের পরও আমাদের আয় বেড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ কোটি টাকায় পৌঁছাবে, যা এখনও খুব বেশি নয়। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া কোনো স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে না।” কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পলিসিধারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং সুশাসনভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে বীমা খাতে প্রবেশহার বাড়ানো।
এনসিআইএস চালু করতে বাড়ছে ব্যয়
বিমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ফি বিধিমালা সংশোধনের যৌক্তিকতায় বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ বলেছে, বিমা খাতে আধুনিক ও স্বচ্ছ নজরদারি নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম (ঘঈওঝ) চালু করা হচ্ছে। এই সিস্টেম বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ডাটা সেন্টার পরিচালনা ও সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণে ভবিষ্যতে নিয়মিত ব্যয় বাড়বে। এ ছাড়া ইওঝউ কেন্দ্রের আওতায় ডিজিটাল অবকাঠামো ও ডাটা সেন্টার পরিচালনায় বার্ষিক প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা ২০২৬ সাল থেকে আইডিআরএকে বহন করতে হবে।
নিজস্ব ভবন ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন
আইডিআরএর নিজস্ব মালিকানাধীন কার্যালয় না থাকায় জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণ বাবদ আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিমা খাতে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স একাডেমি, ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচুয়ারি বাংলাদেশ (ওঅই) ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তুলনা
নিয়ন্ত্রণ ফি বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে ভারতের উদাহরণ টানা হয়েছে। আইডিআরএর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ভারতের মোট গ্রস প্রিমিয়াম প্রায় ৬ লাখ কোটি রুপি হলেও বাংলাদেশে তা ছিল প্রায় ১৮ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। ভারতে প্রতি হাজারে ১ রুপি হারে নিয়ন্ত্রণ ফি আরোপ করা হয়। তবে বাংলাদেশের বিমা বাজারের বাস্তবতা ও নিয়ন্ত্রক ব্যয় বিবেচনায় প্রতি হাজারে ৫ টাকা ফি যৌক্তিক বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
কোম্পানির ওপর প্রভাব সীমিত
আইডিআরএর দাবি, নিয়ন্ত্রণ ন্যায্য ফি বাড়লেও বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব খুব সীমিত হবে। গ্রস প্রিমিয়ামের তুলনায় এই ব্যয় নগণ্য এবং এর ফলে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কাও কম।
স্টেকহোল্ডারদের মতামত
নিয়ন্ত্রণ ফি ধাপে ধাপে বাড়ানোর বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, বিমা খাতের বিভিন্ন সংগঠন এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইডিআরএ।
বাজেট ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা
আইডিআরএর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রায় ৩৭ দশমিক ৯০ কোটি টাকা। বর্তমানে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নিজস্ব আয়ের উৎস শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সংশোধিত নিয়ন্ত্রণ ফি এই ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন