প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইস্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএসআইএ)। বিশেষ করে ৭২০৯ এবং ৭২১০ এইচএস কোডভুক্ত লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামালের ওপর নতুন করে রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপের ফলে বাজারে একটি অস্বাভাবিক শুল্ক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। এই বৈষম্যমূলক শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং দেশীয় সামগ্রিক শিল্পের স্বার্থ রক্ষার্থে জরুরিভিত্তিতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থবিরতা এড়াতে দোকানপাট বন্ধ, মানববন্ধনের মতো কঠোর সামাজিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় সংগঠনটির নিজস্ব কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুজার গিফারী জুয়েল। সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রশংসা করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু শুল্ক কাঠামোর কারণে দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প কীভাবে ধ্বংসের মুখে পড়বে, তার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়ে আবুজার গিফারী জুয়েল বলেন, রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার : ৭২০৯ এবং ৭২১০ হেডিংভুক্ত আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত নতুন রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষা : দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পের স্বার্থকে জাতীয় শিল্পনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।
এ ছাড়া যৌথ আলোচনায় স্থায়ী সমাধান : শুদ্ধ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সব অংশীজনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই শুল্ক কাঠামো প্রণয়ন করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি আমির হোসেন নূরানী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে হট-রোল্ড কয়েল (এইচআরসি) এবং গ্যালভানাইজড স্টিলের (জিপি) মধ্যে স্বাভাবিক মূল্য পার্থক্য সাধারণত প্রতি টনে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রস্তাবিত শুল্ক কাঠামোর কারণে এই ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নিয়মে প্রতি টনে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত শুল্ক ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রচলিত ব্যবধানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এমনিতেই উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের চাপে রয়েছেন। এর ওপর অতিরিক্ত রেগুলেটরি ডিউটি যুক্ত হলে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
আমির হোসেন নূরানী আরও বলেন, ডব্লিউটিও চুক্তি অনুযায়ী অংশীজন বা স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি নির্ধারণ করার কথা ছিল কিন্তু তা করা হয়নি বা আমাদের জানানো হয়নি। একটি শ্রেণিকে প্রতি টনে পঞ্চাশ হাজার টাকা সুবিধা দেওয়ার জন্য অর্থাৎ মানি মেকিং করার জন্য দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে অন্য শ্রেণিকে নিঃস্ব করে দিয়ে আরডি বসানো হয়েছে। তিনি জানান, বছরে এই আরডির ফলে বছরে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা মানি মেকিংয়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যত সুবিধা বড় উদ্যোক্তাদের, বিপরীত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করে আরডি বসানো হয়েছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিল্প-কারখানার জন্য যারা রাষ্ট্রীয় কোনো সুবিধা পায় না তাদের সুরক্ষার জন্য নীতিমালার দাবি জানাচ্ছি। আরডি বসানোর ফলে ৫০ লাখের অধিক কর্মচারী কর্মসংস্থান হারাবে। সংবাদ সম্মেলনে কেরানীগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ঈমান উল্লাহ মাস্তান, মির হাজিরবাগ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাশেম, ধোলাইখাল সিটি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইদুর রহমান মোবারক, কেরানীগঞ্জ সিট ব্যবসায়ী সমিতির আজগর আলী ও সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ আলী ও সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ আবুল কাশেমসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মোহাম্মদ নাসিরউল্লাহ বলেন, এ শিল্পের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়বে, যা বাজারে চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াবে।
বিআইএসআইএ-র পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে আরও বলা হয়, কোনো শিল্প একা বা বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হতে পারে না। একটি বড় বা মূল শিল্পের সাফল্য সর্বদা নির্ভর করে তার সঙ্গে সংযুক্ত শত শত সহায়ক শিল্প, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর। ৭২০৯ এবং ৭২১০ হেডিংভুক্ত পণ্যগুলো কোনো সমাপ্ত বা ফাইনাল পণ্য নয়, বরং এগুলো দেশের হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কৃষি যন্ত্রপাতি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, স্টিল ফার্নিচার, পাইপ উৎপাদন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্প-কারখানার খুচরা যন্ত্রাংশ এবং জাহাজ নির্মাণসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়। দেশের প্রায় চার লক্ষাধিক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প সরাসরি এই কাঁচামাল এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আর এই বিশাল খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা। কাঁচামালের ওপর বাড়তি শুল্কের বোঝা আলটিমেটলি এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মহীনতার ঝুঁকিতে ফেলে দেবে।

