ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

১০ ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেকই ঝুঁকিতে

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬, ০২:০৪ এএম

দেশের ১০টি ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে ঝুঁকিভিত্তিক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে দেশের সব তপশিলি ব্যাংকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে; যা আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকারের চেয়েও বেশি। কেবল ২০২৫ সালেই ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালে এ ধরনের ঋণ বেড়েছিল দুই লাখ ৫৯ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ওই বছর শেষে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের আকার ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণই রয়েছে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা এবং পুনঃতপশিলকৃত ঋণ চার লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

শুধু ২০২৫ সালেই রেকর্ড এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে। এর আগের বছর যার পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে করপোরেট ঋণই ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া মোট ঋণের ৩১ দশমিক ১৬ শতাংশই বৃহৎ ঋণ। অন্যদিকে, উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিতাদেশ থাকায় আরও এক লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বেড়ে যাওয়ার ফলে এক বছরের ব্যবধানে গত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ অনুপাত (সিআরএআর) তিন শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক দুই দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মানে হলো, ব্যাংক খাতে ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কমেছে।

বিপুল এই খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংক খাতে প্রয়োজনীয় চার লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) বিপরীতে রাখা সম্ভব হয়েছে মাত্র দুই লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি থেকে গেছে প্রায় এক লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এদিকে, গত ডিসেম্বরের পর খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বেড়ে এখন পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে (মার্চ পর্যন্ত) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এতে ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ সামনে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী গ্রুপগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তা আর ফেরত দেয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে এ ধরনের চর্চা চলে আসছে। সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় এসব ঋণের বড় অংশ একপর্যায়ে খেলাপি হয়ে পড়ে।

ব্যাংকারদের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে শীর্ষ খেলাপি শিল্পগোষ্ঠীর কোম্পানি বা সুবিধাভোগী কোম্পানিকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে একক গ্রাহক ঋণসীমাসহ অনেক নিয়মই মানা হয়নি। এসব সুবিধাভোগী কোম্পানির অনেকটির নাম সরাসরি সংশ্লিষ্ট গ্রুপের কোম্পানি হিসেবে ছিল না বলেও জানান তারা।

তাদের ভাষ্য, গ্রুপগুলো কাগজপত্র ঠিক রেখে কাগুজে কোম্পানি খুলে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করতে নানা কৌশল নিয়েছে। এসব ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, তা ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ও কর্মকর্তারা জানতেন। তাই তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজনও মনে করেননি।

ব্যাংকাররা আরও বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঋণখেলাপির তালিকা হালনাগাদ হওয়ায় খেলাপি ঋণের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। আগের সরকারের আমলে দেওয়া বিশেষ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ঋণ অনিয়মের তথ্য সামনে আসায় নতুন গ্রুপ ও কোম্পানির নামও তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী আরেক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ। এসব ব্যাংক থেকে বিভিন্ন কায়দায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি বের করে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর।

এর বাইরে সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েও তা পরিশোধ করেনি চট্টগ্রামভিত্তিক গ্রুপটি। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে গ্রুপটির নাম।