দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অভিশাপ এবার জেঁকে বসেছে কৃষি ঋণেও। দীর্ঘদিন কম ঝুঁকির তালিকায় থাকা কৃষি ঋণে হঠাৎ করেই খেলাপি বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। নতুন নীতিমালায় সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল ও ব্যাড লোনের সময়সীমা কমিয়ে আনার পর থেকেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, মার্চে কৃষি ঋণের খেলাপি ছিল ৯ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অক্টোবরে এসে তা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা, যা মোট কৃষি ঋণের প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ছিল মাত্র ৫ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।
আগে কৃষি ঋণ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হতে সময় লাগত এক বছর, ডাউটফুলে তিন বছর আর ব্যাড লোন হতে লাগত ৫ বছর। কিন্তু নতুন নীতিমালায় এই সময়সীমা কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৩, ৬ ও ১২ মাস। ফলে আগে যেসব ঋণ নিয়মিত ছিল, সেগুলো এখন দ্রুতই খেলাপির তালিকায় চলে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিতরণকৃত কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ।
অক্টোবর পর্যন্ত কৃষি ঋণে খেলাপির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৯টি ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ ৩৯ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা হলেও খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো একই সময়ে কৃষি খাতে ১৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা, যা মাত্র ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। এই খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ৯৭০ কোটি টাকা; উল্লেখযোগ্যভাবে, এসব ব্যাংকের কোনো খেলাপি ঋণ নেই।
কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের অঙ্কে ব্যাংকগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি অক্টোবর পর্যন্ত ২১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে ১২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা খেলাপি, যা সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির বিতরণ করা ৯ হাজার ১২৮ কোটি টাকার কৃষি ঋণের মধ্যে খেলাপি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে আছে বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। ব্যাংকটি ২ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা খেলাপি। চতুর্থ স্থানে জনতা ব্যাংক। অক্টোবর পর্যন্ত তাদের বিতরণ করা ৩ হাজার ১০৯ কোটি টাকার কৃষি ঋণের ৭১৬ কোটি টাকা খেলাপি। পঞ্চম স্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫৩০ কোটি টাকা; ব্যাংকটি ২ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা কৃষি ঋণ দিয়েছে।
ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ৩৭৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের বিপরীতে খেলাপি ২৪২ কোটি টাকা। সপ্তম স্থানে রূপালী ব্যাংক। ৫৭৯ কোটি টাকার কৃষি ঋণের মধ্যে খেলাপি ২২৪ কোটি টাকা। অষ্টম স্থানে আছে একীভূত হওয়া প্রক্রিয়ায় থাকা এক্সিম ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, যার মধ্যে ১৫৮ কোটি টাকা খেলাপি। নবম স্থানে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। ৭৫১ কোটি টাকার কৃষি ঋণের ১৪৫ কোটি টাকা খেলাপি। আর দশম স্থানে রয়েছে এবি ব্যাংক। তাদের বিতরণ করা ২২৯ কোটি টাকার কৃষি ঋণের মধ্যে খেলাপি দাঁড়িয়েছে ১২৬ কোটি টাকা।
শতাংশের হিসাবে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণে শীর্ষে রয়েছে শরিয়াহ-ভিত্তিক ইউনিয়ন ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা কৃষি ঋণের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশই এখন খেলাপি, যা তালিকার সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক, যার খেলাপির হার ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (৫৫ দশমিক ২২ শতাংশ) এবং এবি ব্যাংক (৫৫ দশমিক ১৩ শতাংশ)।
পরের অবস্থানগুলোতে রয়েছেÑ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৪২.৪২ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক ৩৮.৬৫ শতাংশ, সোনালী ব্যাংক ৩৬.৮৩ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংক ৩৩.৮৫ শতাংশ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৩০.৩৯ শতাংশ, বিডিবিএল ২৬.৯৬ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ২৫.৩৮ শতাংশ, জনতা ব্যাংক ২৩.০৫ শতাংশ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ২১.২৩ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক ১৮.২৪ শতাংশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১৯.৩৭ শতাংশ, বেসিক ব্যাংক ১৬.৬৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংক ১৪.২৯ শতাংশ। এই তালিকায় প্রকাশ পেয়েছে কোন ব্যাংকের কৃষি খাতে ঝুঁকি কতটা গভীর হয়েছে এবং খেলাপির বেড়ে চলা প্রবণতা ব্যাংকিং খাতকে কতটা চাপে ফেলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলো মৎস্য খাতে ১ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি, চার মাসে দারিদ্র্যবিমোচন কার্যক্রমে ৫২২ কোটি, শস্য উৎপাদন খাতে ৫ হাজার ৬২৩ কোটি, কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ৬০ কোটি, সেচযন্ত্র ক্রয়ে ৪৮ কোটি এবং শস্য মজুত ও বিপণন খাতে ১৬ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, আন্তর্জাতিক মানদ-ে যেতে গিয়েই সময়সীমায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে খেলাপি বেড়েছে। খুব দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, কৃষি খাতে খেলাপি বেড়ে গেলে উৎপাদন, রপ্তানি, এমনকি দেশজুড়ে মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি হবে। খাদ্য নিরাপত্তার কারণে এই খাতকে আরও বেশি নীতিসহায়তায় আনতে হবে। তিনি কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিকায়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশেষ ঋণ স্কিমের সুপারিশ করেন।

