পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ কেবলই আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তা মানুষের অস্তিত্ব, মনস্তত্ত্ব এবং আত্মশুদ্ধির গভীরতম স্মারক। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই পরম ত্যাগের উপাখ্যান মূলত মানুষের অহং, ভালোবাসা এবং সমর্পণের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি-শাসিত এবং পুঁজিবাদী সমাজে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ঈদুল আজহা উদ্?যাপন করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের বহুমাত্রিক রূপান্তর চোখে পড়ে। একদিকে ইসলামের শাশ্বত, অপরিবর্তনীয় বিধান ও আধ্যাত্মিক চেতনা; অন্যদিকে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যাশলেস অর্থনীতি এবং সামাজিক মর্যাদার নতুন সমীকরণ। প্রশ্ন হলো, আধুনিকতার এই তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে যেতে আমরা কি কোরবানির মূল ইসলামিক দর্শনকে টিকিয়ে রাখতে পারছি, নাকি উৎসবের বাহ্যিক আড়ম্বর আমাদের ভেতরের আত্মত্যাগের চেতনাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
ইসলামি শরিয়তে কোরবানির মূল ভিত্তি হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ এই একটিমাত্র ঐশ্বরিক বাণীই কোরবানির সম্পূর্ণ অন্তর্নিহিত দর্শনকে উন্মোচিত করে। ইসলাম আমাদের শেখায়, পরম করুণাময়ের কোনো অবয়ব বা পার্থিব ক্ষুধা নেই যে তাঁর পশুর মাংসের প্রয়োজন হবে। কোরবানি হলো বান্দার পক্ষ থেকে একটি প্রতীকী আনুগত্যের প্রকাশ। মানুষ যখন তার নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে কেনা একটি প্রিয় পশুকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে, তখন সে আসলে পরোক্ষভাবে এই ঘোষণাই দেয় যে, বিশ্বজগতের প্রতিপালকের আদেশের সামনে সে তার নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, নিজের স্বার্থ এবং নিজের অহংকারকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। যেমনটি সুরা আন-আমে বর্ণিত হয়েছে, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।’ ইসলামি দর্শনে পশুর গলায় ছুরি চালানো মানে কেবল একটি প্রাণীর জীবনাবসান নয়; বরং মানুষের ভেতরে যে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের মতো ‘পশুত্ব’ লুকিয়ে আছে, তাকে চিরতরে জবেহ করা। যদি পশুর রক্ত ঝরানোর পর মানুষের মনের ভেতরের হিংসা ও অহংকার অপরিবর্তিত থেকে যায়, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে সেই কোরবানি কেবলই মাংস খাওয়ার উৎসবে রূপ নেয়, তা আত্মশুদ্ধির সোপান হতে পারে না।
তবে আমরা বর্তমানে বাস করছি এক এমন যুগে, যেখানে বিজ্ঞাপনের ভাষা আমাদের মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুঁজিবাদের ছোঁয়া প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবকে এক একটি বাণিজ্যিক ইভেন্টে রূপান্তর করতে চায়। ঈদুল আজহাও এই রূপান্তরের বাইরে নয়। বিগত কয়েক বছরে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় কোরবানির পশুকে কেন্দ্র করে এক ধরনের তীব্র প্রদর্শনীবাদ বা শো-অফ কালচার গড়ে উঠেছে। পশুর হাটগুলো এখন আর কেবল ধর্মীয় ইবাদতের কেনাকাটার স্থান নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা সামাজিক আভিজাত্য প্রদর্শনের রঙ্গমঞ্চ। কে কত লাখ টাকা দিয়ে পশু কিনলেন, কার গরুর আকার কত বড়, কার গরুর ওজন কত মণÑ এসব বিষয় এখন চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে ফেসবুকের নিউজফিড পর্যন্ত আলোচনার মূল খোরাক। ভাইরাল হওয়ার এই আধুনিক ব্যাধি কোরবানির অন্তর্নিহিত নম্রতা ও গোপনীয়তার সৌন্দর্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। যখন একজন কোরবানি দাতা তার পশুর দাম নিয়ে অহংকার করেন, তখন তিনি অজান্তেই ইসলামের ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো ইবাদতের পাপে লিপ্ত হন। অথচ সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বিখ্যাত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ যখন নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে লোকদেখানো প্রশংসার দিকে ধাবিত হয়, তখন সেই ইবাদত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এই পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতা সমাজের মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত মানুষের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। যেখানে কোরবানি হওয়ার কথা ছিল ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্বের অবসান ঘটানোর হাতিয়ার, সেখানে এটি উল্টো সামাজিক বৈষম্যের নতুন এক সূচক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই রূপান্তরের সমান্তরালে প্রযুক্তির ছোঁয়া কোরবানির প্রক্রিয়াকে আমূল বদলে দিয়েছে। ডিজিটাল হাট, অনলাইন কোরবানি প্ল্যাটফর্ম এবং ক্যাশলেস সোসাইটির ধারণা এখন আমাদের প্রাত্যহিক যাপনের অংশ। পশুর হাটের কাদা-মাটি, দালালের খপ্পর, ছিনতাইয়ের ভয় কিংবা জাল টাকার ঝুঁকি এড়াতে শহরের একটি বড় অংশের মানুষ এখন ঘরে বসে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে গরু বা ছাগল পছন্দ করছেন। ডিজিটাল ওয়ালেট বা ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে লাখ টাকা মুহূর্তেই পরিশোধ হয়ে যাচ্ছে। এই আধুনিকায়নের যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ইতিবাচক দিকটি হলোÑ এটি মানুষের সময় ও শ্রম বাঁচাচ্ছে, অর্থপাচার ও জাতি রোধ করছে এবং শহুরে জীবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সহজ করছে। কিন্তু এর ছায়া দিকটি হলোÑ এটি কোরবানির ভেতরের আবেগ ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে যান্ত্রিক করে তুলছে।
সুনানে ইবনে মাজাহর একটি হাদিসে এসেছে, সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই কোরবানিগুলো কী। তিনি বললেন, ‘তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ সাহাবিরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কী নেকি আছে।?? তিনি বললেন, ‘পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ এই যে পশমের বিনিময়ে নেকির আধ্যাত্মিক হিসাব, তা কিন্তু পশুর প্রতি মায়া এবং পরম যতেœ লালন-পালনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
একইভাবে, ইসলামি সমাজব্যবস্থায় ঈদুল আজহার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, এটি সম্পদের সাময়িক পুনর্বণ্টনের একটি চমৎকার বার্ষিক প্রক্রিয়া। ইসলাম নির্দেশ দেয় কোরবানির মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করতে: এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য এবং বাকি এক ভাগ সম্পূর্ণভাবে সমাজের দরিদ্র, ইয়াতিম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য। এই বণ্টনের পেছনে যে সামাজিক সাম্যবাদের দর্শন রয়েছে, তা আধুনিক ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতেও বিরল। বছরের অধিকাংশ দিন যে দরিদ্র মানুষটি পুষ্টিকর খাবার বা প্রোটিন থেকে বঞ্চিত থাকে, এই দিনে তার ঘরেও যেন আনন্দের আলো পৌঁছায়, এটাই ইসলামের লক্ষ্য। সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানি প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নিজেরা খাও, সংরক্ষণ করো এবং সদকা করো।’ কিন্তু আধুনিক ফ্রিজ-সংস্কৃতি এই মহান দর্শনকে কিছুটা সংকুচিত করে ফেলেছে। আধুনিক নাগরিক জীবনে মানুষের সঞ্চয় করার প্রবণতা এত বেশি যে, অনেক সময় লোক দেখানো উপায়ে সামান্য কিছু মাংস গরিবদের দিয়ে বাকি সিংহভাগ মাংস ফ্রিজের ড্রয়ারে মাসের পর মাস সংরক্ষণের জন্য রেখে দেওয়া হয়। অনেকে আবার মাংসের এই প্রাচুর্যকে কেন্দ্র করে বড় বড় বার্বিকিউ পার্টি বা ভোজসভার আয়োজন করেন, যেখানে অতিথিরা সবাই সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির। এর ফলে মাংসের বণ্টনটা ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকে, যা ইসলামের মূল স্পিরিটের পরিপন্থি। আধুনিক মুসলিম হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে যে, কোরবানির মাংস জমানোর বস্তু নয়, এটি বিলিয়ে দেওয়ার আনন্দ। সঞ্চয়ের মানসিকতা পরিহার করে উৎসর্গের মানসিকতা জাগ্রত করাই ইসলামের আধুনিক দাবি।
এর বাইরেও ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অর্ধেক বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্রতা হচ্ছে ইমানের অংশ।’ কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কোরবানির ঈদের দিন আমাদের শহরগুলোর রাস্তাঘাটের চিত্র ইসলামের এই শিক্ষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। রাস্তার মোড়ে, ফুটপাতে বা অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে পশু জবাইয়ের পর রক্ত ও বর্জ্য যেভাবে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়, তা যেমন পরিবেশ দূষণ করে, তেমনি তীব্র দুর্গন্ধ ও নানা রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। আধুনিক যুগে নাগরিক সচেতনতা এবং ইসলামিক নৈতিকতার সংমিশ্রণ ঘটানো আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমরা যদি নিজেদের ইবাদত পালন করতে গিয়ে অন্য কোনো মানুষের কষ্টের কারণ হই, তবে তা ‘হাক্কুল ইবাদ’ বা মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্ভ্রম ক্ষুণœ করা হারাম। সুতরাং, আমাদের অসচেতনতায় যদি সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ অবরুদ্ধ বা কলুষিত হয়, তবে আল্লাহ তা সহজে ক্ষমা করবেন না। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই করা, পশু জবাইয়ের পরপরই রক্ত পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা, ব্লিচিং পাউডার ছিটানো এবং বর্জ্য নিষ্কাশনের দায়িত্ব কোরবানিদাতাকেই নিতে হবে। পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়া আমাদের দেশের এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোর আয়ের একটি বড় উৎস। আধুনিক সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার যে সংকট, তা মোকাবিলায় চামড়া নষ্ট না করে দ্রুত তা প্রক্রিয়াজাতকরণ বা সঠিক মূল্যে বিক্রি করে সেই অর্থ দরিদ্রদের মাঝে পৌঁছে দেওয়া আমাদের ধর্মীয় ও নাগরিক কর্তব্য।
কোরবানির ঈদ আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পঙ্কিলতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আমরা যখন পশুর গলায় ছুরি চালাই, তখন আমাদের মনে এই সংকল্প করা উচিত যে, আমরা আমাদের ভেতরের লোভ নামক পশুকে জবাই করছি, আমাদের অহংকার নামক পশুকে উৎসর্গ করছি। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় এই ভাবটি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, মনের পশুরে কর জবাই, পশু জবেহ করিস না ভাই। যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর আমাদের মধ্যে না ঘটে, তবে আমাদের কোরবানি হবে কেবলই মাংস খাওয়ার উৎসব। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি কঠোর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যার কোরবানি করার সামর্থ্য আছে, অথচ সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।’ এই হাদিসটি যেমন সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানিকে আবশ্যক করে, তেমনি পরোক্ষভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, কোরবানি কেবল একটি লৌকিক প্রথা নয়, এটি আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়ার চরম আত্মিক যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যম। পরিশেষে বলা যায়, ঈদুল আজহা আমাদের প্রতি বছর এক নতুন ভোরের বার্তা দিয়ে যায়। আসুন, এবারের ঈদুল আজহায় আমরা হৃদয়ে ধারণ করি ইসলামের শাশ্বত সহমর্মিতার বাণী। আমাদের কোরবানি হোক নিখাদ, আমাদের চারপাশের পরিবেশ থাকুক পরিচ্ছন্ন, আর আমাদের সমাজ গড়ে উঠুক পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যরে ভিত্তিতে। তবেই সার্থক হবে আমাদের উৎসব, তবেই সুন্দর হবে আমাদের এই পৃথিবী। সবাইকে পবিত্র ঈদুল আজহার আন্তরিক শুভেচ্ছা।

