ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

শিশুর হাম

লক্ষণ প্রতিকার ও ঘরোয়া যত্ন 

আরশি প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৬, ০৬:০৯ এএম

সন্তানের শরীরে সামান্য জ্বর বা ছোট লাল দানা দেখলেই মায়েদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুদের মধ্যে হাম বা মিজেলসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এটি কেবল একটি সাধারণ চর্মরোগ নয়, বরং একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা সঠিক সময়ে যতœ না নিলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সচেতনতাই হলো প্রধান ঢাল।

সংক্রামক এই ভাইরাসের প্রকৃতি

হাম মূলত রুবেলা নামক একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি একটি বায়ুবাহিত রোগ যা আক্রান্ত শিশুর হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নির্গত লালাবিন্দুর মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাস বাতাসে বা কোনো জিনিসের পৃষ্ঠে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুর শরীরে লাল দানা বা র্যাশ বের হওয়ার চার দিন আগে থেকেই এটি অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।

লক্ষণ চেনার উপায়

হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়। শুরুতে তীব্র জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। র্যাশ বের হওয়ার কয়েক দিন আগে শিশুর গালের ভেতরের অংশে লবণের দানার মতো ছোট সাদা দাগ দেখা দিতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোপলিক স্পট বলা হয়। এরপর কান এবং কপালের পাশ থেকে লাল দানা শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় দিন পর এই দানাগুলো কালচে হয়ে যায় এবং জ্বর কমতে শুরু করে।

আক্রান্ত শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা

শিশুর হাম হলে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরে সেবা করা জরুরি। যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর সরাসরি কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেই। এই সময়ে শিশুকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার যেমন ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে বলে শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখা এবং অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হামে আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার যেমন গাজর, মিষ্টি কুমড়া বা পাকা পেঁপে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

খাদ্যাভ্যাস ও পরিচ্ছন্নতা

অসুস্থ অবস্থায় শিশুর হজম শক্তি কমে যায়, তাই তাকে সহজে হজম হয় এমন নরম খিচুড়ি, জাউ ভাত বা সুজি খাওয়ানো উচিত। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া বা ফ্রিজের ঠান্ডা পানি এই সময়ে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা ভালো। অনেকে মনে করেন হাম হলে গোসল করানো যাবে না, তবে এটি ভুল ধারণা। কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করে দিলে বা গোসল করালে শিশুর অস্বস্তি ও চুলকানি কমে। পরিষ্কার কাপড় দিয়ে নিয়মিত শিশুর চোখ মুছে দিতে হবে এবং কড়া আলো থেকে দূরে রাখতে হবে।

টিকা ও স্থায়ী প্রতিরোধ

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা দেওয়া। সরকারি ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশুর নয় মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং পনেরো মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা নিশ্চিত করতে হবে। একবার হাম হলে শরীরে স্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তবে ঝুঁকি এড়াতে টিকাদানই সর্বোত্তম পথ। ঘরোয়া যতেœ সুস্থ না হয়ে যদি শিশুর তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়, জ্বর ১০৪ ডিগ্রির নিচে না নামে, কান দিয়ে পুঁজ পড়ে কিংবা খিঁচুনি দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।