ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ‘হিন্দু চরমপন্থিদের’ বিক্ষোভ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ১০:৫৭ পিএম

ভারতের দিল্লির কূটনৈতিক এলাকায় গত শনিবার রাতে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেছে ‘হিন্দু চরমপন্থিদের’ একটি দল। গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার মো. ফয়সাল মাহমুদকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিলেও ভারত কিংবা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করছিল না। বিকেলে প্রথমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফেসবুকে এ নিয়ে একটি বিবৃতি দেন, আর তার কিছু পরেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা একটি ব্রিফিং করেন। তারপরই জানা যায়, শনিবার রাতে দিল্লির চানক্যপুরীতে যেখানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অফিস, সেখানে একদল হিন্দু চরমপন্থি নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল। এ সময় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে উদ্ধৃত করে ফেসবুকে দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, একদল যুবক বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসের হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু বেষ্টনী ভেদ করা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘিœত করার কোনো চেষ্টা ছিল না। যদিও ভারতের এ বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

সপ্তাহখানেক ধরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। এতে দুই দেশেই তিক্ত ঘটনা বেড়ে চলেছে। গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন এবং তার সন্দেহভাজন হামলাকারী ‘ভারতে পালিয়েছেন’Ñ এমন খবর সামাজিক মাধ্যমে চাউর হওয়ার পর ঢাকায় মূলত ভারতবিরোধী প্রচার নতুন গতি পেয়েছে।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে যা ঘটেছিল :

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার রাত ৯টার দিকে হাইকমিশনের সামনে ‘হিন্দু চরমপন্থিদের’ একটি দল বিক্ষোভ করে। রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টা নাগাদ তিনটি গাড়িতে করে কিছু লোক বাংলাদেশ হাউসের মূল ফটকের সামনে উপস্থিত হয়। এ সময় তারা বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এ সময় তারা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে গালাগাল করে। কিছুক্ষণ অবস্থানের পর এক সময় তারা সেখান থেকে চলে যায়। যদিও রাতের ওই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

তবে গতকাল বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেছেন, ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য :

এদিকে গতকাল বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পাতায় মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে উদ্ধৃত করে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে শুরুতেই অভিযোগ করা হয়েছে যে, গত শনিবার রাতের ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের কতিপয় গণমাধ্যম ভুল সংবাদ প্রকাশ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শনিবার রাতে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ২০-২৫ জন যুবক বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ করে স্লোগান দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের সব সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা দাবিতেও  স্লোগান দেয়। কিন্তু হাইকমিশনের বেষ্টনী ভেদ করা বা কোনো ধরনের নিরাপত্তা বিঘেœর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা ছিল না।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রাতে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামে হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। যদিও এ ঘটনায় ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র‌্যাব। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে আটক করেছে র‌্যাব ও স্থানীয় পুলিশ।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওই যুবকদের দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ওই ঘটনার ‘ভিজ্যুয়াল এভিডেন্স’ জনগণের জন্য উন্মুক্ত, চাইলে সেটি যে কেউ দেখে নিতে পারেন। সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী তার ভূখ-ের মধ্যে বিদেশি মিশনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণে ভারত উদ্বিগ্ন উল্লেখ করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে ভারত নিবিড় দৃষ্টি রাখছে। সাথে দিপু চন্দ্র দাসের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানানো হয় বিবৃতিতে।

ভারতের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের :

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘দিল্লিতে বাংলাদেশের মিশন কূটনৈতিক এলাকার বেশ ভেতরে এবং সেখানে হিন্দু চরমপন্থিদের ২৫ জনের একটি দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন’।

বিক্ষোভকারীদের আসতে দেওয়া হয়েছে মন্তব্য করে উপদেষ্টা বলেন, ‘যেভাবেই হোক তারা এসেছে। আসতে পারার কথা নয় কিন্তু। তারা যে বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিক হত্যার প্রতিবাদ করে চলে গেছে তা নয় কিন্তু। তারা আরও অনেক কিছু বলেছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রমাণ নেই, কিন্তু শুনেছি তাকে (বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে) হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত আসতে পারবে কেন। হুমকি দিতে পারবে কে।’

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘সাধারণত হাইকমিশন বা দূতাবাস এলাকায় কোনো গ্রুপ গেলে আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে জানানো হয়। পুলিশ দূরেই তাদের আটকে দেয়, যা সব দেশেই দেখা যায়। তারা শুধু এসে দুটো স্লোগান দিয়েছে তা নয়। হাইকমিশনার ও তার পরিবার ওখানে বাস করে। তারা হুমকি বোধ করেছে, আতঙ্কিত হয়েছে কারণ দুজন গার্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।’

ময়মনসিংহের দিপু চন্দ্র দাসের হত্যাকা-ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন এবং এ বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নিরাপত্তার বিষয়ে যেসব দায়িত্ব, সেটি ঠিকমতো পালিত হয়নি। আমরা আশা করব, এ ধরনের পরিবেশ আর হবে না। দু’পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ আছে। সে প্রেক্ষাপটেই প্রেসনোট এসেছে। আমরা এখনো ভরসা রাখছি যে, ভারত যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে।