তারেক রহমানের ১৮ বছর সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলেন তারা। অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দিয়েছেন দীর্ঘদিন। এখন তারেক রহমানের ফেরার সময় হয়েছে, এ কথা ভেবে আবেগাপ্লুত হচ্ছেন যুক্তরাজ্য বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। নেতার বিদায়ে মিশ্র অনুভূতি তাদের। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা নেতাকর্মীরা কোনোদিন কল্পনাও করেননি তারা দলের শীর্ষ নেতার এমন সংস্পর্শ পাবেন। ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমান যুক্তরাজ্য বিএনপির সব শ্রেণির নেতাকর্মীদের আপন হয়ে উঠেছিলেন। বছরে দুটি ঈদসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি নেতাকর্মীদের সময় দিয়েছেন। এমনকি প্রতি জুমার নামাজে স্থানীয় কিংস্টন ইসলামিক কালচারাল মসজিদে দেখা হতো নেতাকর্মীদের সাথে। গত ১৬ ডিসেম্বর লন্ডনে সিটি প্যাভিলিয়নে যুক্তরাজ্য বিএনপি পরিবারসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন তারেক রহমান। এ সময় বক্তৃতায় তিনি নিজে ও নেতাকর্মীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
যুক্তরাজ্য বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মিছবাহুজ্জামান সুহেল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৮ বছর প্রিয় নেতার সংস্পর্শে ছিলাম যুক্তরাজ্য বিএনপি পরিবার। এটা আমাদের সৌভাগ্য ছিল যে, আগামীর রাষ্ট্রনায়কের সরাসরি দিকনির্দেশনা পাওয়া। আমাদের আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। বিগত বছরগুলোতে প্রত্যেকটি ঈদ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল তার সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার। অনুভূতি অবশ্যই আবেগের। মফস্বলে রাজনীতি করে প্রবাসে আসা আমাদের জন্য দলের শীর্ষ নেতার আদর শাসন পাওয়া অনুকূল ভাগ্য বটে। এই ক্রান্তিলগ্নে হাল ধরতে দেশের উদ্দেশে উনার যাওয়া একান্তই জরুরি।’
যুক্তরাজ্য যুবদল সভাপতি আফজল হোসেন বলেন, ‘প্রিয় নেতাকে বিদায় দিতে আমরা আবেগাপ্লুত। আমাদের স্নেহ-মমতা দিয়ে তিনি আগলে রেখেছিলেন। এটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় ছিল যে, তিনি আমাদের সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এখন দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে উনার দেশে ফেরা খুবই জরুরি।’
জানা যায়, ২০০৭ সালে এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৮ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য সপরিবার যুক্তরাজ্যে আসেন। এরপর থেকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিম শহরতলি এলাকা কিংস্টন আপন টেমসে স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানের সাথে একটি ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করছেন। সেই বাড়ি থেকে একটি চেয়ার, একটি টেবিল আর একটি ক্যামেরাকে সঙ্গী করেই দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে তার ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিএনপি নেতারা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছিলেন না তিনি কখন ফিরবেন। এর মধ্যে বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য আংশিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। সেখানে জানানো হয়, বগুড়া-৬ আসনে প্রথমবারের মতো ভোট করবেন তিনি। ওই ঘোষণার পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাবনা জোরালো হয়। গত ২৩ নভেম্বর ফের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। এ অবস্থায় তারেক রহমান কেন ফিরছেন নাÑ সেই প্রশ্ন আবার সামনে আসে। ২৯ নভেম্বর তারেক রহমানের এক বক্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাক্সক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’ তারেক রহমানের দেশে ফিরতে বাধা কোথায়Ñ সেই প্রশ্ন তখন জোরেশোরে উঠতে থাকে। তিনি লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন কি নাÑ সেখানে তার ‘স্ট্যাটাস’ কী, সেসব প্রশ্নও তোলেন কেউ কেউ। এরমধ্যে গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘২৫ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে দেশে ফিরবেন তারেক রহমান।’ এরপর গত ১৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন তিনি।
নেতাকর্মীদের সাথে বিদায় নিতে গিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের সঙ্গে আমি ১৮ বছর ছিলাম। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আপনাদের সঙ্গে বহু স্মৃতি রয়ে গেছে। আপনাদের সঙ্গে বহু দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করেছি। তারেক রহমান বলেন, প্রত্যেকের কাছে আমার একটা অনুরোধ, ২৫ তারিখে ইনশাআল্লাহ আপনাদের দোয়ায় আল্লাহর রহমতে আমি দেশে ফিরে যাব। কিন্তু, এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষের কাছে আমার অনুরোধ, দয়া করে কেউ আপনারা সেদিন এয়ারপোর্টে যাবেন না। তিনি আরও বলেন, এয়ারপোর্টে গেলে একটি হট্টগোল তৈরি হবে। মানুষ জানবে যে, এরা সবাই বাংলাদেশি। এতে করে দেশের সুনাম নষ্ট হবে। দলের সুনাম নষ্ট হবে। যারা সেদিন এয়ারপোর্টে যাবেন না, আমার আজকের এই অনুরোধ যারা রাখবেন, আমি ধরে নেব তারা দল এবং সর্বোপরি দেশের সম্মানের প্রতি মর্যাদা রাখবেন। আর আমার অনুরোধ করার পরও যারা যাবেন, আমি ধরে নেব তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য সেখানে গিয়েছেন।

