বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে ফেনী জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অন্যদিকে তার শৈশবের ঠিকানা দক্ষিণ শ্রীপুর গ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই যেন থমকে গেছে সময়। যে মজুমদার বাড়িতে প্রতিদিনের সকাল শুরু হতো কোলাহল আর ব্যস্ততায়, আজ সেখানে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। বাড়িজুড়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার শব্দ। চোখের পানিতে ভিজে গেছে প্রতিটি মুখ। মঙ্গলবার সকালে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের কৃতিসন্তান খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদ মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে পুরো বাড়ির চিত্র। খবরটি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই মজুমদার বাড়ির উঠানে বসে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন শূন্যের দিকে, কেউ আবার মাথায় হাত দিয়ে বিলাপ করছেনÑ এই মানুষটা আর নেই! বিশ্বাসই হচ্ছে না, বাড়ির দেয়ালে টাঙানো খালেদা জিয়ার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন স্বজনরা। ছবিটির দিকে তাকালে যেন মনে হয়, এই তো তিনি কথা বলবেন, খোঁজ নেবেন, পরিবারের সবার নাম ধরে ডাকবেন। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম, আজ আর সেই ডাক শোনা যাবে না।
খালেদা জিয়ার চাচাতো ভাই শামিম মজুমদার স্মৃতিচারণ করে জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও এই পরিবারের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সম্পর্ক ছিল গভীর আত্মিক বন্ধনে বাঁধা। দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়াÑ এই স্মৃতিগুলোই আজ কান্নায় ভাসাচ্ছে। দুপুর গড়াতেই মজুমদার বাড়িতে ভিড় করেন প্রতিবেশী, শুভানুধ্যায়ী ও বিএনপি নেতাকর্মীরা। কারো মুখে কথা নেই, কারো চোখে শুধু জল। উঠানের এক পাশে কোরআন তেলাওয়াত চলছে, অন্য পাশে নীরবে বসে আছেন শোকাহত মানুষগুলো। পরিবেশজুড়ে এক গভীর বিষণœতা। খালেদা জিয়া আমাদের কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের একজন আপন মানুষ। সুখে-দুঃখে সব সময় খোঁজ নিতেন। আজ তিনি চলে যাওয়ায় বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেছে।
খালেদা জিয়ার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে তানজিম হোসেন তাঈম হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমরা একজন রাজনীতিবিদকে নয়, একজন মমতাময়ী মানুষকে হারালাম। তিনি আমাদের কাছে একজন মায়ের মতো ছিলেন। দক্ষিণ শ্রীপুর গ্রামের আকাশ-বাতাস যেন আজ ভারী হয়ে আছে শোকে। গ্রামজুড়ে একটাই আলোচনাÑ খালেদা জিয়া আর নেই। যেন একটি অধ্যায়, একটি যুগ শেষ হয়ে গেল।
ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমরা ফেনী তথা বাংলাদেশ একজন অভিভাবককে হারালাম। সকালে প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠেছে। এক সময় যে মজুমদার বাড়ি ছিল রাজনৈতিক আলোচনা, স্মৃতিচারণ আর প্রাণবন্ত কথোপকথনে মুখর, আজ সেখানে শুধু নিস্তব্ধতা। ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো, ফাঁকা চেয়ারগুলো নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে একজন মানুষ কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন এই পরিবারের হৃদয়ের সঙ্গে। প্রিয় নেত্রীর বিদায়ে কাঁদছে শুধু একটি বাড়ি নয়, কাঁদছে দক্ষিণ শ্রীপুর গ্রামসহ সারা বিশ্ব। কাঁদছে স্মৃতি, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সেই সম্পর্ক, যা কখনো মৃত্যুতে মুছে যায় না।

