বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষস্থানীয় নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ‘বন্দি’ থাকবে না। তিনি জানান, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথে কোনো ‘প্রতিবন্ধকতা’ সৃষ্টি করবে না। উল্লেখ্য, ১৭ ফেব্রুয়ারি (আজ মঙ্গলবার) বাংলাদেশে পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
ঢাকার গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেবে এবং ভারতের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, হাসিনা প্রকৃতপক্ষে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাকে শাস্তি দেওয়ার একটি গণদাবি রয়েছে এবং আমরা মনে করি, ভারতের উচিত তাকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা। তবে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর না করাটা বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্কসহ বৃহত্তর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বাধা হবে না। আমরা আরও উন্নত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।’ মির্জা ফখরুল জোর দিয়ে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি ইস্যুতে ‘বন্দি’ হয়ে থাকা উচিত নয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ নেতা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বারবার প্রতিবেশী দেশটির কাছে তাদের হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। তবে গত ১৭ মাসে ভারত এসব অনুরোধে সাড়া দেয়নি। মির্জা ফখরুল জানান, অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকা- ও অপরাধমূলক কর্মকা-ে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রী ও আমলাদের বিচারের জন্য একটি আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সেই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।’
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কিছু জটিল সমস্যা থাকলেও সেগুলো যেন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে ছাপিয়ে না যায়। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ‘আমেরিকা ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের শুধু একটি বিষয়ে আটকে থাকা উচিত নয়।’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের পর যখন শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভারতে অবস্থান করছিলেন, তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেন। পরবর্তীকালে তার আমন্ত্রণে ঢাকা সফর করেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে যখন শেখ হাসিনা রাজনীতিতে অভিষেকের জন্য বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দিল্লি সফর করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। মির্জা ফখরুল একে একটি ‘রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘আগামী বছরের আগেই গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের অধীনে ফারাক্কার পানির বিষয়টি সামনে আসবে। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যার ইস্যু তো রয়েছেই। আমাদের এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারি না। আমাদের আলোচনা করতে হবে। যারা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলে, তারা পাগলের মতো কথা বলছে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতো মির্জা ফখরুলও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে। তারেক রহমানের সঙ্গে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মির্জা ফখরুল জানান, প্রতিশোধ ও সহিংসতা বাংলাদেশের সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির পথে ক্ষতিকর। তার মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে সহিংস অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সামাজিক ঐক্য ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কারণ ‘অভ্যুত্থানের নেতারা অধ্যাপক ইউনূসকে বেছে নিয়েছিলেন’ এবং ‘অধ্যাপক ইউনূস অভ্যুত্থানের নেতাদের দেওয়া রূপরেখার বাইরে যেতে পারেননি।’
বিএনপির ৩১ দফা এজেন্ডাকে মির্জা ফখরুল একটি সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা ভারত ও বাংলাদেশকে বাণিজ্য, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার সুযোগ দেবে। তিনি বলেন, ‘ভারতের কারিগরি শিক্ষায় ভালো সম্পদ রয়েছে এবং আমাদের বিপুলসংখ্যক বেকার যুবক রয়েছে। এই বেকার যুবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের সহায়তা প্রয়োজন, যাতে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে চাকরি পেতে পারে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন বিএনপি সরকারকে আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা মোকাবিলা করতে হবে। সরকার বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট পুনরায় মূল্যায়ন করে দেখবে কোনগুলো অপচয়মূলক। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে আমরা কেবল সেগুলোই রাখব, যা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে।’

