ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দৃষ্টি এখন সংরক্ষিত নারী আসনে

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০১:২৯ এএম

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি এখন সংরক্ষিত নারী আসনে। জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেত্রীদের। বিএনপির একঝাঁক প্রভাবশালী ও দীর্ঘদিন রাজপথের অগ্রসেনানী নারীরা এরই মধ্যে আসন নিশ্চিতে শুরু করেছেন নানামুখী লবিং। বসে নেই প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের নেত্রীরা। বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনগুলো সংসদের চোখে অনেকটা অলংকারের মতো। তবে তাদের প্রত্যাশা, ত্রয়োদশ সংসদে যেন শুধু সংখ্যা নয়, নারীর প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করা হয়। 

বিভিন্ন দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অনেকে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে প্রোফাইল (বৃত্তান্ত) তৈরি করে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠানো শুরু করেছেন। আবার অনেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। যদিও বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, নারী আসনের বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে বিএনপির অনেক নেতাকে গত সপ্তাহে বিভিন্ন মন্ত্রীর দপ্তরে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজ বলয়ে সংরক্ষিত আসন নিশ্চিতের জন্য তদবির করতে দেখা গেছে।

হিসাব অনুযায়ী, এবার সংসদে ৩৭টি সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেতে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের শতাধিক নেত্রী আগ্রহী। আলোচনার শীর্ষে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। আরও আছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন। মহিলা দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী এবং ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি মনোনীত পরাজিত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলিও মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে আছেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী সাবেক মহিলা দলের সভাপতি শিরিন সুলতানা, সুলতানা আহমেদ, নাজমুন নাহার বেবী, সাবেক এমপি শাম্মী আকতার, নিলোফার চৌধুরী মনি, আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আকতার রানু, ইয়াসমিন আরা হক, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম ও ফরিদা ইয়াসমিন, নারায়ণগঞ্জ মহিলা দলের সভাপতি রহিমা শরিফ মায়া, সানজানা চৈতি পপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা, হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী এবং সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেনও আছেন এই দৌড়ে। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী শওকত আরা উর্মি, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, নাদিয়া পাঠান পাপন, শাহিনুর সাগর, সাবেক এমপি ইয়াসমিন আরা হক, চেমন আরা বেগম, জাহান পান্না, ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আলম এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনায় আছেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন, কনক চাঁপা, চিত্রনায়িকা মৌসুমী এবং সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে শাহনাজ পলির নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদও সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ মহিলা দলের সভাপতি রহিমা শরিফ মায়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাজনীতিতে শ্রম ও ঘামের সঙ্গে একাডেমিক কম্বিনেশন, অর্থাৎ পড়াশোনা ও যোগ্যতারও সংমিশ্রণ দরকার।’

ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী নেত্রী সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বিগত সময়ে মাঠের ভূমিকাÑ সবকিছু বিবেচনা করেই সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন।

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। সেই হিসাবে প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টিত হবে। কোনো কারণে বণ্টন করা আসন সংখ্যা মোট আসনের চেয়ে বেড়ে গেলে ভগ্নাংশের হিসাবে হেরফের হতে পারে। আইনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লটারির বিধানও রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পায়। আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পাবে। অন্য তিনটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। দলগুলো হলোÑ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিস।

জানা গেছে, জামায়াত তার ইতিহাসে এবার ত্রয়োদশ সংসদে সর্বোচ্চসংখ্যক নারী আসন পেতে যাচ্ছে। সংসদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন, এমন উপযুক্ত নারীদের মনোনয়ন দেবে দলটি। এ জন্য দলের মহিলা বিভাগ থেকে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।

ঈদুল ফিতরের আগেই সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচন হতে পারেÑ এ গুঞ্জন সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কাছে জানাতে চাইলে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি জানান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়নের বিষয়টি ঈদের আগে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে। দেশের সিটি করপোরেশনের সেবা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, সেটি গতিশীল করতে ঢাকার দুই সিটিসহ সারা দেশে ছয়টি সিটি করপোরেশনে ইতোমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজস্ব গাইডলাইন তৈরি করা। কারা কী মানদ-ে সংসদে যাবেনÑ সেটি তার দল ঠিক করবে। আসন পাওয়ার বিষয়টি আইনি বাধ্যবাধকতার ব্যাপার। সুতরাং জামায়াতের নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আইন অনুসারে, শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের তথ্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে ইসিতে পাঠানো হয়। সাধারণ নির্বাচনের ফল গেজেট প্রকাশের ২১ কার্যদিবসের মধ্যে দল বা জোট তাদের প্রার্থী তালিকা ইসিতে জমা দেয়। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ইসি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের জন্য শপথগ্রহণ করা সদস্যদের দলভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করে। নির্বাচন আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে মনোনয়ন, বাছাই, প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ নির্ধারণ করবে। ইসি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য এখনো হাতে সময় আছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন। তাদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন সাতজন। এর মধ্যে ছয়জন বিএনপির এবং একজন স্বতন্ত্র। সংরক্ষিত ৫০টি আসন যুক্ত হলে সংসদে মোট নারী সদস্য হবেন ৫৭ জন, যা ৩৫০ সদস্যের সংসদে প্রায় ১৬ শতাংশ।