ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ফেসবুক পোস্ট দিয়ে অনলাইনে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের নামে ১০০ টাকা করে আদায় করার অভিযোগ উঠেছে আছিম পাটুলি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে। আবেদনের বিষয়টি স্বীকার করে ইমরুল কায়েস বলেন, ২০ জন নারী আবেদন করেছে। তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে, আবেদন করার বিষয়টি আমাকে না জানিয়ে পরিষদের উদ্যোক্তা শান্ত করেছেন। ইমরুল কায়েস উপজেলার আছিম পাটুলি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সাবেক ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য।
ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের নামে নারীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি উপজেলার আছিম পাটুলি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ের ভেতরে।
ভিডিওতে দেখা যায়, বেশকিছু নারী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের উদ্যোক্তা শান্তর আশপাশে ভিড় জমিয়েছে। প্রত্যেক নারীই আবেদন করার জন্য শান্তকে তাগাদা দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, আমার টাকা আগে নেন। এভাবে ২০ জন নারী ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ১০০ টাকা দিয়ে আবেদন করেছেন।
এদিকে, এর আগে গত বুধবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ফেসবুক আইডি থেকে আবেদনের একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীরা আবেদন করার জন্য ইউপি কার্যালয়ে আবেদন করার জন্য ভিড় জমান।
চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস তার ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেন। ওই ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘অনলাইনে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করতে কোনো ফরমের প্রয়োজন নেই। এনআইডি কার্ড, এককপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, মোবাইল নম্বর এবং স্বহস্তে স্বাক্ষর থাকলেই আবেদন করা যাবে। বি: দ্র: শুধু নারীরা আবেদন করতে পারবে। আমরা অফিসিয়াল কোনো নির্দেশনা পাইনি কিন্তু অনলাইনে আবেদন হচ্ছে।’
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ঘোষিত সারা দেশে নারীদের মাঝে ফ্যমিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে জেলার নান্দাইল উপজেলাসহ ১৪ উপজেলার একটি করে ইউনিয়নে পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় ফুলবাড়িয়া উপজেলার নাম না থাকার পরেও উপজেলার আছিম পাটুলি ইউনিয়নে প্রচারের মাধ্যমে আবেদন শুরু করা হয়েছে। যা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আবেদন করা এক নারী বলেন, শুনেছি ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন শুরু হয়েছে। তাই ১০০ টাকা নিয়ে আবেদন করতে আসছি। চেয়ারম্যানের ভাতিজা টাকা জমা নিয়েছেন, কিন্তু কোনো ফরম দেয়নি।
অপর এক নারী বলেন, আমিও শুনেছি ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করা হচ্ছে। তাই আবেদন করতে আসছি। আবেদন করার সরকারি নির্দেশনা আছে কি না তা জানা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালের শেষের দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ইমরুল কায়েস জয়ী হন। পরে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের প্রখম সপ্তাহে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে আনুমানিক ৬ মাস পর ১০ টাকা কেজির চালের কার্ড দেওয়ার নামে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠে চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে।
পরে ইউনিয়ন পরিষদের ৯ ইউপি সদস্য চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। পরে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইমরুল কায়েসকে ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর ইমরুল কায়েস উচ্চ আদালতে আপিল করে স্বপদে অস্থায়ীভাবে নিজ পদে বহাল হন। নিজ পদে বহাল হয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যদের বহিষ্কার করেন। তবে, বহিষ্কৃত ইউপি সদস্যরা উচ্চ-আদালতে আপিল করে তাদের পদ ফেরত পান।
আবেদন করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠা উদ্যোক্তা শান্তর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শান্ত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ানম্যান ইমরুল কায়েসের আত্মীয়। আত্মীয়তার সুবাদে কোনো নিয়োগ ছাড়াই শান্তকে উদ্যোক্তার চেয়ারে বসান। সম্প্রতি সুরাইয়ার নামে আরও এক নারীকে সরকারি কোনো নির্দেশনা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে উদ্যোক্তা শান্তর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে, আছিম পাটুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারছি, ২০টি আবেদন করা হয়েছে। যারা যারা আবেদন করেছে, তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
নির্দেশনা ছাড়া কীভাবে আবেদন করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর শান্ত আবেদন নিয়েছে। এখানে আমার কিছু করার নেই।
শান্তর নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শান্ত আমার আত্মীয় না। আগের চেয়ারম্যান তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার নিয়োগপত্রও আগের চেয়ারম্যান দিয়েছিলেন। তাই তার নিয়োগের বিষয়টি আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে আছিম পাটুলি ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, চেয়ারম্যান ১০ টাকা কেজি চালের কার্ড দেওয়ার নামে চাল আত্মসাৎ করেছিল। পরে তা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর ইমরুল কায়েস উচ্চ-আদালতে আপিল করে স্বপদে অস্থায়ীভাবে নিজ পদে বহাল হন। তিনি বহাল হয়েই আমিসহ আরও তিনজনকে ষড়যন্ত্র করে বহিষ্কার করে। পরে আমরা উচ্চ-আদালতে আপিল করে স্বপদে বহাল হয়েছি। তবে, বিভিন্ন হুমকি-ধমকির কারণে পরিষদে যাওয়া হয় না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করার বিষয়ে শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন