ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়া মোজতবা খামেনি এখন দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর আসনে বসতে যাচ্ছেন। ইরানের প্রভাবশালী বিশেষজ্ঞ পরিষদ, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস, তাকে দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করছে।
৫৬ বছর বয়সি মোজতবার বাবা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরানে বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার নতুন অধ্যায় সূচিত হলো।
অবশ্য মোজতবা খামেনির এই উত্থান আকস্মিক নয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি তার বাবার কার্যালয়ের প্রধান ফটকরক্ষক বা গেটকিপার হিসেবে কাজ করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক পদে না থাকলেও তিনি ছিলেন ইরানের শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি সুকৌশলে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশেষ করে ২০০৯ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে তার নেপথ্য ভূমিকার কারণে তিনি বিক্ষোভকারী ও গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকারীদের কাছে একটি বিতর্কিত নাম।
মোজতবার ক্ষমতার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি’র সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ককে। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ যুদ্ধ করেন। তার সেই সময়ের অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এই গভীর সামরিক যোগাযোগই তাকে ক্ষমতার দৌড়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মোজতবার এই নতুন অভিষেক নানা আইনি ও ধর্মীয় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাকে হতে হয় একজন উচ্চপর্যায়ের ধর্মতাত্ত্বিক বা ‘মুজতাহিদ’। কিন্তু মোজতবা খামেনি ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হলেও তার নামের পাশে ‘আয়াতুল্লাহ’র মতো শীর্ষ ধর্মীয় পদবি নেই। এ ছাড়া তার কোনো সরাসরি প্রশাসনিক বা নির্বাহী অভিজ্ঞতাও নেই, যা দেশটির সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার জন্য অন্যতম শর্ত হিসেবে গণ্য। তা সত্ত্বেও বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে মোজতবাকে এই পদে আসীন করা হয়েছে।
মোজতবা খামেনির এই ক্ষমতা গ্রহণকে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এক বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিপ্লব পরবর্তী ইরানে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, সেখানে পিতার পর পুত্রের ক্ষমতায় আসাকে অনেক বিশ্লেষক ‘বংশতান্ত্রিক শাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। বর্তমান অস্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে মোজতবা খামেনি কীভাবে ইরানকে নেতৃত্ব দেনÑ এখন সেটিই দেখার বিষয়।

