এক দশক আগেও আমাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল মূলত রান্নাঘরকেন্দ্রিক। কিন্তু দ্রুতগতির আধুনিক জীবন আর শিল্পায়নের যুগে মানুষের ডাইনিং টেবিল দখল করে নিয়েছে রঙিন মোড়কের প্যাকেটজাত খাবার। সহজলভ্য আর সুস্বাদু এই খাবারগুলোই যে আসলে মানবদেহের হৃদযন্ত্রের জন্য এক মরণফাঁদ তৈরি করছে, তার প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক বৈশ্বিক গবেষণায়।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সমন্বিত মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত অতি-প্রসেসড ফুড যেমন- প্যাকেটজাত চিপস, চকোলেট, কোমল পানীয় বা ফ্রোজেন খাবার খান, তাদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি।
গবেষকরা বলছেন, এই ঝুঁকি এখন আর কেবল বয়স্কদের জন্য সীমাবদ্ধ নেই, বরং তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি এক ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
গবেষণার সারসংক্ষেপ : চিকিৎসা বিজ্ঞানের শীর্ষ সাময়িকী ‘দ্য আমেরিকান জার্নাল অব মেডিসিন’ এবং ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অতি-প্রসেসড খাবারের এই ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছিলেন। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত পরিচালিত বেশ কয়েকটি ফলোআপ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এই ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি ‘দ্য আমেরিকান জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত সর্বশেষ গবেষণায় ৪ হাজার ৭৮৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাস এবং তাদের কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. চার্লস এইচ. হেনেকেন্স গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছি যে, যারা তাদের প্রতিদিনের মোট ক্যালোরির একটি বড় অংশ অতি-প্রসেসড খাবার থেকে গ্রহণ করেন, তাদের কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় অর্ধেক (৪৭ শতাংশ) বেড়ে যায়। এমনকি যারা ধূমপান করেন না বা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।’
অতি-প্রসেসড খাবার কোনগুলো : অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না যে কোন খাবারগুলো আমাদের হার্টকে ঝুঁকিতে ফেলছে। গবেষণায় অতি-প্রসেসড খাবারের একটি নির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হয়েছে। এগুলো মূলত কলকারখানায় একাধিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং এতে এমন সব উপাদান থাকে যা সাধারণ রান্নাঘরে থাকে না।
এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে প্যাকেটজাত স্ন্যাকস: চিপস, কুড়মুড়ে চানাচুর, পটেটো ক্র্যাকার্স বা নিমকি। মিষ্টিজাতীয় খাবার: ইন্ডাস্ট্রিয়াল চকোলেট, ক্যান্ডি, প্যাকেটজাত কেক, বিস্কুট, ডোনাট এবং পেস্ট্রি। কোমল পানীয়: কার্বোনেটেড বেভারেজ, কোল্ড ড্রিংকস, কৃত্রিম ফ্লেভারড জুস এবং এনার্জি ড্রিংক। ইনস্ট্যান্ট ফুড: ইনস্ট্যান্ট নুডলস, স্যুপের প্যাকেট এবং পাস্তা। প্রসেসড মিট: সসেজ (মাংসের স্টিক), নাগেটস (মাংসের বড়া বা চিকেন চপ), সালামি (মাংশের চাকা যা স্যান্ডউইচের মধ্যে বা পিৎজার ওপরে থাকে ) এবং হট ডগ (মিট স্যান্ডউইচ বা লম্বা রুটির মাংসের রোল)। রেডি-টু-ইট মিল: ফ্রোজেন পিৎজা, বার্গার এবং ফ্রিজে রাখা হয় এমন আগে থেকে তৈরি করা খাবার।
গবেষণার ফল : অতিপ্রসেসড খাবারগুলো শরীরে প্রবেশের পর কয়েকটি প্রধান উপায়ে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে। এর মধ্যে রয়েছে- ধমনীতে ভয়াবহ প্রদাহ : এই প্রদাহ ধমনীর দেয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সেখানে চর্বি জমতে সাহায্য করে, যা পরে ব্লকে পরিণত হয়। সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন বৃদ্ধি : গবেষণার প্রধান লেখক ড. হেনেকেন্স দেখিয়েছেন, অতি প্রসেসড খাবার রক্তে ‘হাই সেনসিটিভ সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন’ বা এইচএস-সিআরপি-এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রোটিনটিকে হৃদরোগের অন্যতম বড় পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হয়। রক্তে এর উপস্থিতি মানেই হলো আপনার হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালীতে বড় ধরণের অস্থিরতা চলছে, যা যে কোনো মুহূর্তে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঘটাতে পারে। বিপাকীয় বিপর্যয় ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: অতি প্রসেসড খাবারে থাকে উচ্চমাত্রার পরিশোধিত চিনি এবং ট্রান্স-ফ্যাট। এগুলো শরীরে প্রবেশের পর ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে হার্টের পেশিকে দুর্বল করে দেয়। লবণের বিষক্রিয়া ও উচ্চ রক্তচাপ : প্যাকেটজাত খাবার সুস্বাদু রাখতে এতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম বা লবণ ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত সোডিয়াম সরাসরি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদপি-কে রক্ত পাম্প করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেইলিউরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট : আন্তর্জাতিক এই গবেষণার ভয়াবহতা যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে, তখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেশের বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। দেশীয় স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক সমীক্ষা, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী পাঁচটি প্রধান কারণে দেশের মানুষ এখন ভয়াবহ হৃদঝুঁকির মুখে রয়েছে।
নগরায়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন : দ্রুত নগরায়ন এবং কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়ার ফলে ‘রেডি-টু-ইট’ বা ঝটপট খাবারের চাহিদা বেড়েছে। যা অজান্তেই তাদের হৃদপি-ের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। আগ্রাসী বিপণন ও শিশুদের আসক্তি : বড় কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিপণন কৌশলও অতি প্রসেসড খাবারের ব্যাপক সম্প্রসারণের জন্য দায়ী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাবারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় (লবণ, চিনি ও টেস্টিং সল্টের মিশ্রণে), যা মস্তিষ্কে এক ধরণের সাময়িক আনন্দ দেয়। ফলে শিশুরা একবার এই স্বাদ পেলে বাড়িতে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও তথ্যের লুকোচুরি : ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের (এনএইচএফবি) একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে থাকা প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৯৭ শতাংশই উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে ‘পুষ্টিগুণ’ বা ‘লবণের মাত্রা’সংক্রান্ত যে তথ্য দেওয়া থাকে, ল্যাবে পরীক্ষার পর তার সত্যতা পাওয়া যায় না। প্রান্তিক পর্যায়ে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ: গ্রামের মানুষও এখন তাজা ফলের বদলে পাঁচ-দশ টাকার কৃত্রিম জুস বা রঙিন পানীয় পান করছে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অকাল হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের শিকার হচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
এনএইচএফবির সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, দেশে বাজারজাতকৃত প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৯৭ শতাংশই উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ খাবারে লবণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, দেশে বর্তমানে প্রায় ২১ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে ভুগছেন এবং এর একটি বড় কারণ হলো এই প্যাকেটজাত খাবার।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বর্তমানে এক ধরনের খাদ্য-বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের তরুণদের মধ্যে অকাল হার্ট অ্যাটাকের হার বেড়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হলো অতি প্রসেসড খাবার এবং শরীরচর্চার অভাব’।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাইউম সরকার জানান, দেশে অনেক প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে পুষ্টিমান বা উপাদানের সঠিক তথ্য লেখা থাকে না। লবণের পরিমাণ আড়াল করা হয়, যা সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর বলেন, অতি প্রসেসড খাবার বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রাকৃতিক খাবারের বদলে এসব প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা তরুণ প্রজন্মের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তার মতে, এখনই সচেতন না হলে এই ‘খাদ্য-সংস্কৃতি’ আগামীর সুস্থ প্রজন্ম গড়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
জীবন রক্ষায় সুপারিশমালা : খাবারের নামে বিষ গ্রহণ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। প্যাকেটজাত খাবারের বদলে মানুষকে শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম এবং বাড়িতে তৈরি সাধারণ খাবারে ফিরে যেতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনে প্যাকেটজাত চিপস, নুডলস বা কোমল পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে। পরিবারে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে যাতে শিশুদের টিফিনে অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবার না দেওয়া হয়। কোমল পানীয় বা প্যাকেটজাত জুসের বদলে ডাব, লেবুর শরবত বা সাধারণ পানি পানের অভ্যাস করতে হবে এবং সরকারের উচিত প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে লবণের মাত্রা অনুসারে লাল বা সবুজ সংকেত ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে কোন খাবারটি ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি তামাকজাত পণ্যের মতো এসব ক্ষতিকর খাবারগুলোর বিজ্ঞাপনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।

