ইরানে ঢুকে নাটকীয় অভিযান চালিয়ে এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ সময় ইরানের কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় মার্কিন বাহিনীকে। জানা গেছে, এই উদ্ধার অভিযানকে কেন্দ্র করে মধ্য ইরানে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘ইতিহাসের অন্যতম সাহসী উদ্ধার মিশন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এদিকে ইরানের দাবি, তারা ওই উদ্ধারকাজে নিয়োজিত বেশকিছু মার্কিন আকাশযানকে ধ্বংস করেছে। অবশ্য মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছে, তাদের কোনো সদস্য এই অভিযানে নিহত বা আহত হননি।
দীর্ঘ ৩৭ দিন ধরে চলমান যুদ্ধের মধ্যে গতকাল রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ইরান এই হুমকিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্পের আলটিমেটামকে একটি ‘অসহায় ও বুদ্ধিহীন কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে গতকাল ইরান জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের ৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ ছাড়া মাহশাহর পেট্রোকেমিক্যাল জোনে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ ১৭০ জন আহত ও পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইতালির প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বনেতারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জরুরি আলোচনায় বসছেন। অন্যদিকে, সংঘাতের স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় স্যাটেলাইট ইমেজিং কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলের যুদ্ধকালীন ছবি প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
উদ্ধার অভিযান সাহসিকতা, নাকি ঝুঁঁকিপূর্ণ আগ্রাসন : গত শুক্রবার ইরানের আকাশসীমায় ভূপাতিত একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধার করতে বিশেষ অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র অনুযায়ী, কয়েকশ বিশেষ বাহিনীর সদস্য এই অভিযানে অংশ নেয়। শনিবার গভীর রাতে পরিচালিত এ অভিযানের সময় তীব্র সংঘর্ষ হয়। মার্কিন পক্ষের দাবি, যুদ্ধবিমানে থাকা নিখোঁজ কর্নেলকে সফলভাবে উদ্ধার করে ইরানের বাইরে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। তবে ইরান বলছে, এই অভিযানের সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন, দুটি পরিবহন বিমান এবং দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে। উভয় পক্ষের দাবির মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
যেভাবে উদ্ধার করা হয় মার্কিন ক্রুকে : মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ কর্নেল পদমর্যাদার অফিসারকে উদ্ধারের অভিযানটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশন। জানা গেছে, বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর ওই অফিসার প্যারাশুটে করে দক্ষিণ ইরানের একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবতরণ করেন। সেখানে তিনি একটি পিস্তল হাতে প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় একা কাটিয়েছেন। ধরা পড়া এড়াতে তিনি একটি পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে ছিলেন এবং নিয়মিত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন।
এই অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা প্রযুক্তির সাহায্যে পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা অফিসারের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করে পেন্টাগনকে জানায়। একই সময়ে ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে সিআইএ একটি ‘ডিপেপশন ক্যাম্পেইন’ বা ধোঁকা দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করে। তারা গুজব ছড়ায় যে, অফিসারকে আগেই উদ্ধার করে ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাতে ইরানি বাহিনীর তল্লাশি শিথিল হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, উদ্ধারকাজে ডজনখানেক মার্কিন বিমান ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। শত শত স্পেশাল ফোর্স সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন। নিচু দিয়ে উড়ে আসা হেলিকপ্টার এবং সেগুলোকে সুরক্ষা দিতে আসা অন্যান্য যুদ্ধবিমানের সহায়তায় এই ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ অভিযান চালানো হয়। উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর (আইআরজিসি) মধ্যে সরাসরি এবং তীব্র গোলাগুলি হয়।
বিবিসি এবং সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, বিমান থেকে ইজেক্ট (বিশেষ ব্যবস্থায় বের হওয়া) করার সময়ই ওই অফিসার সম্ভবত কিছুটা আহত হয়েছিলেন। প্যারাশুট দিয়ে নামার পর তিনি তার কঠোর প্রশিক্ষণের কারণে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত মার্কিন কমান্ডোরা তাকে শত্রুবেষ্টিত পাহাড় থেকে সফলভাবে উদ্ধার করেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চরম উত্তেজনা : সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই প্রণালি খুলে দেওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় ‘ভয়াবহ পরিণতি’র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ইরান এই হুমকিকে ‘দিশাহারা ও অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি : ইরান জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তাদের অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। মাহশাহর পেট্রোকেমিক্যাল অঞ্চলে হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ১৭০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি হামলার পর রাশিয়া তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, এসব হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
গালফ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত : ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়েতে বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বাহরাইনে পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় আগুন ধরে যায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির শিল্প এলাকায় অগ্নিকা- ঘটে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে।
ইসরায়েল-লেবানন-সিরিয়া ফ্রন্টে নতুন উত্তেজনা : ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইয়েমেনের হুতি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ যৌথভাবে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সিরিয়া সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়ছে।
ইরানের শক্তির মূলভিত্তি আইআরজিসি : এই সংঘাতে ইরানের সবচেয়ে বড় ভরসা তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সক্রিয় সদস্য এবং লক্ষাধিক রিজার্ভ বাহিনী নিয়ে গঠিত এই সংগঠন শুধু সামরিক শক্তিই নয়, বরং ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি যুদ্ধে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধে আইআরজিসি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইন্টারনেট বন্ধ, তথ্যযুদ্ধের নতুন মাত্রা : ইরানে টানা ৩৭ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে দেশটি কার্যত বৈশ্বিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি গোপন রাখার কৌশল হতে পারে।
স্যাটেলাইট তথ্য বন্ধ, অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র : মার্কিন স্যাটেলাইট কোম্পানি প্লানেট ল্যাবস সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ছবি প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এটি প্রমাণ করে, আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু মাটিতে নয়, তথ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া : ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এরই মধ্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্য সফর শুরু করেছেন। অন্যদিকে জাপানের রাজনৈতিক মহলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। একদিকে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপÑ সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তবে এটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

