মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশে হঠাৎ করে জমেছে শান্তির মেঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন, যাতে সম্মত ইরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির সঞ্চার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে- এটি কি সত্যিকারের শান্তি উদ্যোগ, নাকি বড় কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ? অতীতে আকস্মিক সিদ্ধান্ত, কঠোর হুমকি এবং নাটকীয় অবস্থান পরিবর্তনের একাধিক নজির থাকায় ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। দুই সপ্তাহের এই নীরবতা তাই কেবল যুদ্ধবিরতি নয়- এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকাল। যে পরীক্ষার ফলের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বসবে। তবে তেহরান বলছে, এটি নিছক যুদ্ধবিরতি নয়, শর্তসাপেক্ষ বিরতি। তাদের দেওয়া ১০ দফা শর্ত পূরণ না হলে সংঘাতের আগুন যেকোনো সময় ফের জ্বলে উঠতে পারে।
কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই সপ্তাহ উভয় পক্ষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ বলছেন, সামরিক পুনর্গঠন; কারো মতে, আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় আর অর্থনৈতিক চাপ মূল্যায়ন; আবার কারো মতে, আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের সময় এটি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের কথাতেই অনেক কিছুর আভাস মেলে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধবিরতিকে সরলভাবে শান্তির উদ্যোগ ভাবলে ভুল হবে। এটি হতে পারে ‘স্ট্র্যাটেজিক পজ’। বলা যায়, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সময় নিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সেই যুদ্ধে ইসরায়েল, লেবানন, সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো অঞ্চল জড়িয়ে পড়বে। ফলে ট্রাম্পের ‘নিশ্চিহ্ন’ করার বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ভাষা বলেই মনে হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, হুমকি ও যুদ্ধবিরতি- এই দুইয়ের সমন্বয় ট্রাম্পের কৌশলের অংশ হতে পারে। মনে হচ্ছে, এটি ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ নীতি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ড. দেলোয়ার হোসেনের ভাষায়, হরমুজ খোলা রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে শর্ত পূরণ না হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, দুই সপ্তাহ- সময় খুবই অল্প। প্রশ্ন হলো, সামনে কী অপেক্ষা করছে? আলোচনায় অগ্রগতি হলে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, আর ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। অতীতের নজির বলছে, আকস্মিক যুদ্ধবিরতি যেমন এসেছে, তেমনি তা ভেঙেও গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহল এখন অনেক সতর্ক। ট্রাম্পের ঘোষণায় আপাতত বিশ্বে স্বস্তি এলেও সংশয় কাটেনি। এটি কি প্রকৃত শান্তির সূচনা, নাকি বৃহত্তর সামরিক বা রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ- তা নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতা।
এই সংঘাত বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে নতুন ভূরাজনৈতিক বার্তা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নাম উল্লেখ করে ট্রাম্প মধ্যস্থতার কথা বলেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান এই সুযোগে নিজেকে আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের জটিলতা বিবেচনায় এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা অনিশ্চিত।
কূটনীতিকদের একটি অংশ বলছেন, শুধু ট্রাম্পের ঘোষণা নয়, ভেবে দেখতে হবে ইরানের কৌশল আর শর্ত আরোপকেও। তারা কি অবস্থান শক্ত করে নিজেদের আরও গুছিয়ে নিতে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাজি হয়েছে? সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ শক্তি হলেও, ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তি- যাদের রয়েছে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক। ইরান দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল, তবে সামরিক সক্ষমতা এখনো কার্যকর।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই সাময়িক বিরতিকে ব্যবহার করতে পারে- কূটনৈতিক অবস্থান জোরদার, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করতে। যদিও তেহরান পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা না হলে তারা আক্রমণ করবে না। অর্থাৎ, তারা সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার কৌশল অনুসরণ করছে।
হরমুজকে বলা যায় বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসনালি। বাংলাদেশেরও। দুই সপ্তাহের জন্য এই জলপথ উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাজারে স্বস্তি আনলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সামান্য উত্তেজনাতেই জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে। একটি বিষয় স্পষ্ট- মধ্যপ্রাচ্যের এই সমীকরণে সামান্য পরিবর্তনও বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এবং আরও ফেলবে।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা- বিশেষ করে যদি তা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়- তাহলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ও তেলের দামের ওপর। সেই সূত্রে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ থেকে ২১ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের তেল-গ্যাস রপ্তানির প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি। কাতারের এলএনজির বড় অংশও এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ফলে হরমুজে সামান্য উত্তেজনা বা অবরোধের আশঙ্কা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা। বাংলাদেশ প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে, যার প্রধান সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কুয়েত এবং ইউএই।
যুদ্ধবিরতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে বিপিসির আমদানি ব্যয় কমবে। সরকারের ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে এবং পাম্প পর্যায়ে জ্বালানি দামে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। হরমুজে ট্যাঙ্কার চলাচলের ঝুঁকি কমলে বিমা প্রিমিয়াম কমে যায়। এতে আমদানিকারক দেশগুলোর আমদানি ব্যয় কমে। ডলারের চাপে কিছুটা শৈথিল্য আসে। এদিকে জ্বালানি দামের চাপ কমলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা কমে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, বাংলাদেশ এখনো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল নয়। ফলে হরমুজনির্ভরতা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। জ্বালানি আমদানি বাংলাদেশের ডলারের বড় ব্যয় খাত। তেলের দাম কমলে আমদানি বিল কমবে, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি কমবে, রিজার্ভে চাপ হালকা হবে, পরিবহন খরচ কমবে। শিল্প উৎপাদন ব্যয় কমলে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপও কমতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ চেইনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এগুলো হচ্ছে ইতিবাচক দিক। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর হলে এবং আবার উত্তেজনা বাড়লে, বাজারে দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে। শিপিং রুট ঝুঁকিপূর্ণ হলে বিকল্প রুটে খরচ বাড়বে। পাশাপাশি এলসি খরচ ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশের জন্য তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি বাজেট ও রিজার্ভে প্রভাব ফেলে। যুদ্ধঝুঁকি কমলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসে, যা আমাদের জন্য ইতিবাচক। তবে এটি টেকসই হবে কি না- সেটাই বড় প্রশ্ন।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত জটিল। যুদ্ধবিরতি কূটনৈতিক সাফল্য হলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল শক্ত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতিতে আনন্দিত হয়ে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। এখন কৌশলগত প্রশ্ন মাথায় রেখে এগোতে হবে। ঢাকার সামনে করণীয় কী? এখন করণীয় হচ্ছে, স্ট্র্যাটেজিক অয়েল রিজার্ভ গঠন, এলএনজি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ, স্পট মার্কেটনির্ভরতা কমানো আর জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ে স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

