মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। জাহাজ জব্দ, পাল্টাপাল্টি নৌ-অবরোধ এবং সামরিক তৎপরতার কারণে আন্তর্জাতিক জলপথটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামে, যা অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে বিশ্ববাজারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা একাধিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান অন্তত দুটি জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও আটকের মাধ্যমে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে এই জলপথ ঘিরে এক ধরনের ‘নি¤œমাত্রার সংঘাত’ তৈরি হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
জাহাজ জব্দ ও হামলার ঘটনা : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে আক্রমণ চালায়। এর মধ্যে দুটি জাহাজÑ পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘এপামিনোন্দাস’Ñ জব্দ করে ইরানের উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ করা হয়, জাহাজ দুটি অনুমতি ছাড়া চলাচল করছিল এবং নেভিগেশন ব্যবস্থায় অনিয়ম ছিল। এ ছাড়া আরেকটি কন্টেইনার জাহাজে গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটেছে। যদিও এতে কোনো প্রাণহানি হয়নি। তবে জাহাজটির নিয়ন্ত্রণকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা ব্যবস্থা : ইরানের পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলোকে আটক বা তাদের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অন্তত তিনটি ইরানি ট্যাংকার ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি জলসীমা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টির বেশি জাহাজকে ফিরে যেতে বা দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক জলসীমায় উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে অভিমত পর্যবেক্ষকদের। এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বেসামরিক প্রধান জন সি ফেলান পদত্যাগ করেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, অবিলম্বে তার এ পদত্যাগ কার্যকর হবে। ফেলানের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আন্ডার সেক্রেটারি হাং কাও ভারপ্রাপ্ত নৌমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা : বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি থাকলেও তা কার্যত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা হবে না।
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘নৌ অবরোধ বজায় রেখে কোনো যুদ্ধবিরতি অর্থবহ হতে পারে না।’ তিনি এটিকে যুদ্ধবিরতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইরানের জাহাজ জব্দের ঘটনাকে তারা সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে না, কারণ জাহাজগুলো মার্কিন বা তাদের মিত্রদের নয়। তবে এই অবস্থান কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’ (কেএএন) দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি আগামী রোববার শেষ হচ্ছে বলে ইসরায়েলকে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের আলোচনার পরিবর্তে তেহরানের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছেন। এর আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছিলেন, ইরানের কাছ থেকে কোনো প্রস্তাব পাওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব : হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি : সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে ভাসমান মাইন থাকার আশঙ্কাও রয়েছে, যা সামরিক অভিযানকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে জানিয়েছে, প্রণালিতে মাইন পরিষ্কার করতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে এই জলপথ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সাগর তলদেশে ইন্টারনেট কেবলে হামলার হুমকি ইরানের : পারস্য উপসাগরের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল ও ক্লাউড অবকাঠামো ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে বলে এই প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ। এই সংবাদমাধ্যমটি আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ। পারস্য উপসাগরের নিচে থাকা ইন্টারনেটের বিভিন্ন অবকাঠামোর মানচিত্র প্রকাশ করে তাসনিম নিউজ জানায়, বন্দর, জাহাজ চলাচলের পথ এবং জ্বালানি স্থাপনার পাশাপাশি এখন সাবমেরিন কেবল ও আঞ্চলিক ডেটা সেন্টারগুলোও ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হয়েছে। তথ্য অনুসারে, এ পথ দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগের মূল কেবলগুলো গেছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আলোচনার চেষ্টা : উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আলোচনার পরবর্তী দফা শুরু হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক মহলে সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি জানান, ইরান সব সময়ই আলোচনার পথ খোলা রেখেছে এবং সমঝোতাকে স্বাগত জানায়। তবে প্রকৃত আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী আচরণ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত প্রভাব : হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য এলাকাতেও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হামলা, সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা এবং সীমান্তে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন