ইরানকে ঘিরে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ইরানের বিরুদ্ধে ‘স্বল্পমেয়াদি কিন্তু শক্তিশালী’ সামরিক হামলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেন্টকমের পরিকল্পনায় ইরানের তেল রপ্তানি অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার এবং আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়াদের নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নয়, বরং দ্রুত ও ব্যাপক আঘাতের মাধ্যমে তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
এ পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালির কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই হামলার অনুমোদন দেননি। তিনি আপাতত নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের কৌশলকেই বেশি কার্যকর মনে করছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, এই অর্থনৈতিক চাপ ‘বোমার চেয়েও কার্যকর’।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি : মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘ডার্ক ঈগল’ নামে পরিচিত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি গতিতে ছুটতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্র দূরপাল্লার অত্যন্ত সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ বাংকার ও ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই সামরিক পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেছেন বলে জানা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার অর্থ এই নয় যে, হামলা অবশ্যম্ভাবী। বরং এটি ইরানের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়ানোর অংশ।
নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ : গত কয়েক মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার উৎস সীমিত করে দেশটিকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করাই এই কৌশলের উদ্দেশ্য।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ইরানের প্রায় ৫০ কোটি ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে থাকা ইরানি ব্যাংক হিসাবও জব্দের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ইরানি তেলের সঙ্গে লেনদেন করলে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের বিরুদ্ধেও ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করা হবে।
তবে ইরান এসব চাপকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে দাবি করেছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল এরই মধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের তেলমন্ত্রী মহসিন পাকনেজাদও দাবি করেন, মার্কিন নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও দেশটির জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘœ ঘটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরান শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় বাধ্য হবে। অন্যদিকে তেহরান বিশ্বাস করে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধবিরোধী জনমতের কারণে ওয়াশিংটন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে যেতে চাইবে না।
আলোচনায় অচলাবস্থা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় দফার প্রত্যক্ষ আলোচনা বাতিল হয়েছে। ট্রাম্প জানান, এখন আলোচনা টেলিফোনের মাধ্যমে চলছে। তার ভাষায়, প্রতিবার দীর্ঘ বিমানযাত্রা করে আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
ইরান সম্প্রতি একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি নৌ-অবরোধ তুলে নেয়, তা হলে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচির আলোচনা পরে করার প্রস্তাব দেয় তেহরান। এদিকে ওয়াশিংটন শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান চাওয়ায় আলোচনা অচল হয়ে পড়ে।
চলমান সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার ভূমিকায় রয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, উভয় পক্ষের মধ্যে পর্দার আড়ালের কূটনীতি চলছে এবং পাকিস্তান একটি মধ্যপন্থা বের করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার দেশ সক্রিয় রয়েছে।
পুতিনের সহায়তার প্রস্তাব : এই সংকটের মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। ট্রাম্প জানান, দেড় ঘণ্টার টেলিফোন আলাপে পুতিন এই আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ট্রাম্প বলেন, পুতিন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে মধ্যস্থতা করতে চান। তবে তিনি রুশ প্রেসিডেন্টকে আগে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ইরানও রাশিয়াকে সম্ভাব্য চুক্তির ‘জামিনদার’ হিসেবে দেখতে চায় বলে জানা গেছে। তেহরানের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যেন নতুন করে হামলা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে মস্কো নিশ্চয়তা দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার : উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে তিনটি মার্কিন রণতরি অবস্থান করছে। বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ টানা ৩০০ দিনের বেশি সময় দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরছে। এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম রণতরি অভিযান হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।
ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম এক সঙ্গে তিনটি মার্কিন রণতরি এ অঞ্চলে অবস্থান করছে।
এদিকে জার্মানিতে মোতায়েন মার্কিন সেনা কমিয়ে আনার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধ নিয়ে জার্মান নেতৃত্বের সমালোচনার জবাবে তিনি এই ইঙ্গিত দেন। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।
লেবাননে উত্তেজনা অব্যাহত : ইরান ইস্যুর পাশাপাশি লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েল জানায়, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়।
একই সময়ে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। পানি শোধনাগার, পর্যটনকেন্দ্র এবং বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির বলেন, লেবাননের সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিরতি চলছে না এবং সেনাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।
যুদ্ধের ব্যয় ও মানবাধিকার সংকট : ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বলে দাবি করলেও বিভিন্ন সূত্র বলছে, প্রকৃত ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ ও অস্ত্র প্রতিস্থাপনের খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ইরানে বিক্ষোভ দমনে কঠোর দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড, গণগ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে তেহরান সরকারের বিরুদ্ধে।
নতুন স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা : বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে ‘স্নায়ুযুদ্ধের’ দিকে বেশি ঝুঁকছে। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে চাইছে। অন্যদিকে ইরান আঞ্চলিক প্রভাব, জ্বালানি বাজার এবং কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইছে।
হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে।

