ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বাজেট ২০২৬-২৭

ঈদের পর হিসাবের ঝড়

পারভেজ খান
প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ০৬:০১ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

আর কিছুদিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদের ছুটি শেষে কদিন গড়াতেই আসবে নতুন আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। সেই ঝড়ের নাম ‘বাজেট’। বাজেট ঘোষণার দিন সংসদে অর্থমন্ত্রী যখন সংখ্যার পর সংখ্যা পড়ে শোনাবেন, তখন কোথাও করতালির শব্দ উঠবে, আবার সেই করতালির আড়ালে শোনা যাবে বাজারের কোলাহল, সংসারের হিসাব আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কারণ বাজেট শুধু কাগজে লেখা আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তব অধ্যায়। কার মুখে হাসি ফুটবে, কার কপালে পড়বে চিন্তার নতুন ভাঁজÑ সেটিই নির্ধারণ করবে বাজেটের অঙ্কের খেলা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের করিডরে এখন পায়ের শব্দ কম, ফাইলের শব্দ বেশি। ব্যস্ততা তুঙ্গে। ফাইলের পর ফাইল, সংখ্যার পর সংখ্যা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাইরে শোনা যাচ্ছে ‘বাস্তবমুখী’, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘জনবান্ধব’ বাজেটের আশ্বাস। কিন্তু ভেতরে চলছে রাজস্ব সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ঋণের কিস্তি এবং মূল্যস্ফীতির জেদি বাস্তবতা নিয়ে হিসাব-নিকাশ। এ কথাটা কে না জানে যে, বাজেট মানে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটা একধরনের রাজনৈতিক জুয়া। সংখ্যার অঙ্কে মোড়া ক্ষমতার খেলা। কে কতটা স্বস্তি পাবে, কে কতটা চাপে পড়বে- এ দুই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে থাকে সরকারের জনপ্রিয়তার ভবিষ্যৎ রেখচিত্র। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাজেট এখন শুধু অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটি রাজনৈতিক আস্থারও পরীক্ষা।

আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে অর্থনীতির অন্দরমহলে বইছে এখন জোর জল্পনা-কল্পনা। আসন্ন বাজেট ঘিরে সরকারের ভেতরে-বাইরে দুই রকম সুর। বাইরে আশ্বাসের আড়ালে ভেতরে শঙ্কিত অনুভব, এত রাজস্ব কোথা থেকে আসবে? কিন্তু আনতে তো হবেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রের ইঙ্গিত, আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় থাকছে না।

সরকারকে একদিকে রাজস্ব বাড়াতে হবে, অন্যদিকে জন-অসন্তোষ এড়াতে হবে। এ দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হলেও সেই চেষ্টাই চালাবে সরকার। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে জন-অসন্তোষ এড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতির অন্দরমহলে ঘোরাফেরা করা আলোচনায় উঠে আসছে- এবারের বাজেট আসলে হবে ‘সামঞ্জস্য রক্ষার বাজেট’, যেখানে একদিকে থাকবে উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতির শঙ্কা। এ দুইয়ের মাঝে সরকারকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে সুঁচের চোখ দিয়ে হাঁটার মতো সতর্কতায়।

অর্থনীতির বাইরেও বাজেট একটি রাজনৈতিক বার্তা। কোন খাতে কত বরাদ্দ, কোন অঞ্চল কত গুরুত্ব পেলÑ সবকিছুই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনি সমীকরণ, উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং সামাজিক শান্তিÑ সব মিলিয়ে বাজেট শুধু অর্থনীতির দলিল নয়, এটি ক্ষমতার ভারসাম্যেরও প্রতিফলন।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, রাজস্ব আদায়ের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে টানাপোড়েন, আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি আর মূল্যস্ফীতির লাগামছাড়া বাস্তবতাÑ সব মিলিয়ে বাজেট ঘিরে তৈরি হয়েছে এক জটিল অর্থনৈতিক ধাঁধা ও অস্থিরতা। প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু উত্তরটা ভয়ানক কঠিনÑ এই বাজেটে কার পকেট ভারী হবে আর কার সংসারে বাড়বে টান?

অর্থনীতিবিদদের আরেক অংশ বলছে, সরকার যদি আমদানি শুল্ক কমানোর পথে না হাঁটে, তাহলে বাজারে স্বস্তি আসবে না। কিন্তু শুল্ক কমালে রাজস্বে দেখা দেবে ঘাটতি। এই দ্বন্দ্বই বাজেট প্রণয়নে মূল মাথাব্যথা হয়ে উঠবে।  বাজারে এখন যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে, তা হলো মূল্যস্ফীতি। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যয়Ñ সবখানেই চাপ বেড়েছে। বাজেট ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। দেখা যেতে পারে, এটা একটা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাজেটে এর সমাধান না থাকলে চাপ গড়াবে সাধারণে।

অপরদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভেতরের হিসাব বলছে, কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কাক্সিক্ষত মাত্রার অনেক নিচে। ফলে নতুন কর আরোপ, করজাল সম্প্রসারণ এবং ভ্যাট-কাঠামো পুনর্বিন্যাস ছাড়া গতি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এমনিতেই সংকুচিত। সেখানে নতুন করের বোঝা চাপালে অর্থনীতির নিচের স্তরে চাপ আরও বাড়বে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব আরও বলছে, কর-জিডিপির অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। ফলে করজাল সম্প্রসারণের চাপ আছে। কিন্তু কর বাড়ানো মানে রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ানো।

তৈরি পোশাক খাত ইতিমধ্যে অর্ডার প্রাইসিং নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তার ওপর যদি বাজেট আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই অভিঘাত শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘরে গিয়ে ঠেকবে।

বিজিএমইএর সাবেক নেতা এবং গার্মেন্টস মালিক সাইফুল ইসলাম বাজেট নিয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার চাপ, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় উদ্বেগ এবং আমদানি ব্যয়ের লাগামÑ সব মিলিয়ে বৈদেশিক খাতে অনিশ্চয়তা প্রকট। আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর শুল্কনীতিতে বড় পরিবর্তন না আনলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া কঠিন। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যেখানে ইতিমধ্যে অর্ডার প্রাইসিং নিয়ে চাপ চলছে। পাশাপাশি বাজেট যদি কাঁচামাল আমদানির ওপর চাপ বাড়ায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা বাজারেও তার প্রভাব পড়বে।

একজন সাবেক পরিকল্পনা কর্মকর্তা বলেন, এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে এবারও বড় ঘোষণা আসতে পারে। কিন্তু বিগত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ যত বড়ই হোক, বাস্তবায়নের গতি অনেক ক্ষেত্রেই ধীর। আসলে আমাদের সমস্যা বরাদ্দ নয়, বাস্তবায়ন। বাজেটে বড় অঙ্ক দেখানো হয়, কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে যে দক্ষতা দরকার, তাতে অনেক ক্ষেত্রেই ঘাটতি থাকে। তবে এই বাস্তবতায় এবার উন্নয়ন বাজেটে ‘প্রায়োরিটি ফোকাস’ বাড়ানোর কথা শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ, সব প্রকল্পে ছড়ানোর বদলে এবার নির্দিষ্ট কিছু মেগা প্রকল্পে জোর দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজেট আলোচনার কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আয় স্থির, ব্যয় বাড়ন্তÑ এই অসম সমীকরণেই তারা সবচেয়ে বেশি চাপে। বাজেট ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কর অব্যাহতি কমানো বা করের আওতা সম্প্রসারণের গুঞ্জন মধ্যবিত্তের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা বেতনভুক্ত শ্রেণি, তাদের ওপর করের চাপ বাড়বে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকার যদি করভিত্তি না বাড়িয়ে সরাসরি বেতনভুক্তদের ওপর চাপ দেয়, তাহলে সেটি সামাজিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট দাঁড়িয়ে আছে এক চাপের চৌরাস্তায়Ñ একদিকে রাজস্ব সংকট, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির আগুন, তার ওপর বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা। এর মাঝে সরকারকে এমন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে, যেখানে অর্থনীতির চাকা থামবে না, আবার মানুষের জীবনও অতিরিক্ত চাপে ভেঙে পড়বে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রের ইঙ্গিত, সরকার এবার ‘সংযম ও সমন্বয়’-এর নীতি নিতে চাইছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কিছুটা কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও এসএমই খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে। তবে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে করের জাল আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও সতর্ক করে বলেন, এই বাজেট হবে আস্থার বাজেট। বিনিয়োগকারী, ভোক্তা ও উন্নয়ন অংশীদারÑ সবার কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দিতে হবে যে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সরকার যদি ব্যয়ের গুণগত মান বাড়াতে পারে, অর্থাৎ কম খরচে বেশি ফল নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সীমিত সম্পদ দিয়েও বড় প্রভাব সৃষ্টি সম্ভব।

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, করভিত্তি সম্প্রসারণ জরুরি, কিন্তু তা যেন বেতনভুক্ত শ্রেণির ওপর একতরফা চাপ হয়ে না পড়ে। এখন প্রয়োজন অনানুষ্ঠানিক খাতকে করকাঠামোর আওতায় আনা। বাজেটের ভাষা যতটা অর্থনৈতিক, তার চেয়েও বেশি প্রতীকী। এটি সরকারের অগ্রাধিকার ও দর্শনের প্রকাশ। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট দাঁড়িয়ে আছে এক চাপের চৌরাস্তায়Ñ একদিকে রাজস্ব সংকট, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির আগুন; একপাশে বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা, অন্য পাশে উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির ভার।

মানুষের অন্দরমহলে তাই এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, আসছে বাজেট কি সত্যিই স্বস্তির বার্তা দেবে, নাকি নতুন চাপের সূচনা করবে?