দেশের সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়ে। ব্যাংকে ১৩ সদস্যের পর্ষদ থাকার কথা থাকলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যাসহ আছেন ১১ জন। পর্ষদ সদস্য সংকটে ভুগছে অগ্রণী ব্যাংক। ১২ সদস্যের পর্ষদ থাকার কথা থাকলেও আছেন ৮ জন।
জনতা ব্যাংক ১০ সদস্যের পর্ষদ পেলেও রূপালী ব্যাংকের পর্ষদে আছেন মাত্র ৭ জন সদস্য। এই অবস্থায় সরকারের মালিকানাধীন তপশিলি ব্যাংকগুলোতে শূন্য থাকা পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে দৌড়ঝাঁপ ও তদবির চলছে। রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এমন ব্যক্তিরা পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে নানা জায়গায় দেনদরবার করছেন। এই তালিকায় আমলাদের পাশাপাশি দু’একজন সাংবাদিকের নামও শোনা যাচ্ছে।
অন্যদিকে রয়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত পেশাজীবীরা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নামও শোনা যাচ্ছে। অথচ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ও সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক যারা দীর্ঘসময় ব্যাংকিং পেশায় ছিলেন তাদের নাম নেই কোথাও। এদিকে মালিকানা ফিরে পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পুরোনো পরিচালকদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।
জানা যায়, দেশে বর্তমানে সরকারের মালিকানাধীন তপশিলি ব্যাংক রয়েছে ৯টি। এর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) বাণিজিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। আর বিশেষায়িত তিন ব্যাংক হলো, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এর বাইরে তপশিলবহির্ভূত ব্যাংক রয়েছে আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক।
পরিচালক সংকটে কোনো কোনো ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সভা করতে পারছেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ঋণ অনুমোদনসহ ঝুলে আছে অনেক সিদ্ধান্ত। দেশের সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়ে। কবে নাগাদ চেয়ারম্যান নিয়োগ হবে তা বলতে পারছেন না কেউ। ব্যাংকে ১৩ সদস্যের পর্ষদ থাকার কথা থাকলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ বর্তমানে আছেন ১১ জন সদস্য। পর্ষদ সদস্য সংকটে ভুগছে অগ্রণী ব্যাংক। ১২ সদস্যের পর্ষদ থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৮ জন। এক সময় এই ব্যাংকটিতে পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ১৬ জন। কোরাম সংকটের কারণে নিয়মিত বোর্ড সভা করতে পারছে না অগ্রণী ব্যাংক। জনতা ব্যাংকে ১০ সদস্যের পর্ষদ পেলেও রূপালী ব্যাংকের পর্ষদে আছেন মাত্র ৭ সদস্য।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রূপালী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান নজরুল হুদাকে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।
সূত্র মতে, চার রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে ১০ পরিচালকের পদ শূন্য আছে। এর বাইরে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে (বিডিবিএল) ৯ পরিচালকের পদ শূন্য।
জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পরিচালক পদে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়োগ না দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা চলছে। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকে একাধিক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত পরিচালকদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে চায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এমন ব্যক্তিরা পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে নানা জায়গায় দেনদরবার করছেন। এই তালিকায় আমলাদের পাশাপাশি দু’একজন সাংবাদিকের নামও শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে, রয়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত পেশাজীবীরা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নামও শোনা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক একজন ব্যাংকার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমলা ও ব্যাংকাররা একটা গণ্ডির মধ্যে থাকেন। শুধু এই দুই পেশা থেকেই পরিচালক নিতে হবে, তা জরুরি নয়। সাবেক ব্যাংকারদের মধ্য থেকেও তাদের কথা ভাবা যায়। তবে সেটি রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে হতে হবে। সুশাসনের জন্য ভালো পরিচালকের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনারও উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
২০০৯ সালের ১২ এপ্রিল জারি করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অর্থনীতিবিদ, সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ, আর্থিক বাজার, মুদ্রানীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি, সাবেক ব্যাংকার, আইনজ্ঞ, ব্যবসায়ী এবং কমপক্ষে একজন নারী পেশাজীবীকে ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য করা হবে। কিন্তু স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তা মানা হয়নি। বরং সমাজসেবক আখ্যা দিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে পর্ষদ সদস্য বানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও মুখ দেখে দেখে ব্যাংকের পরিচালক পদে বসিয়েছে। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখনো ব্যাংকগুলোতে পরিচালক পদে পুরোপুরি নিয়োগ দেয়নি।
এদিকে মালিকানা ফেরত পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবারও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিভিন্ন ব্যাংকের পুরোনো পরিচালকরা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এ জন্য আইন অনুযায়ী নামে-বেনামে নেওয়া ঋণের অর্থ পরিশোধ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনাসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হবে তাদের। সম্প্রতি একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংকের সাবেক মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের মাধ্যমে। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আবারও সক্রিয় হচ্ছেন ব্যাংকের সাবেক পরিচালকসহ কয়েকটি বিতর্কিত গোষ্ঠী।
নতুন আইন অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংক পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার এ পর্যন্ত যে অর্থ ব্যয় করেছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে আগের মালিকরা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। শুধু পাঁচ ব্যাংক নয়, ইসলামী ব্যাংকের পুরোনো পরিচালকদেরও ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘পূর্ববর্তী মালিক ও শেয়ার হোল্ডারদের আমরা যাদের বোর্ড থেকে অপসারণ করেছি তাদের ফিরে আসতে কিছু শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ঋণের অর্থ পরিশোধ, পাচারের অর্থ ফেরত আনা এবং তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়ে আসলে আর বাধা নেই।’
ব্যাংক খাতের আস্থা ফেরাতে এর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করার তাগিদ বিশ্লেষকের। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি পুরোনো মালিকরা আবারও প্রভাব বিস্তার শুরু করেন, তাহলে এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকের পেশাদারিত্ব নষ্ট হলে, এ খাত আস্থার সংকটে পড়বে বলেও জানান তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য এ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিতের তাগিদ তাদের।

